২২তম ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে কাতারে। এতে অংশগ্রহণ করছে ৩২টি দেশ। এই ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বের খেলাপ্রেমিকদের মধ্যে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। আমাদের দেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এ খেলাকে ঘিরে আমাদের দেশে ভক্তদের আবেগ-উৎসাহ যেন একটু বেশি। আর তাদের এই অতিরিক্ত আবেগ- উৎসাহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নিজ দেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করলেও অন্য দলকে সমর্থনের ক্ষেত্রে আমাদের ফুটবল প্রেমীদের উৎসাহের কমতি নেই। এ বিষয়টা খারাপ নয়; কিন্তু তাদের এমন সমর্থন প্রকাশের ধরনটা যখন অদ্ভুত বা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা প্রশ্নবিদ্ধ হয় স্বাভাবিকভাবেই—যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়।
খেলা মানুষকে আনন্দ দেয়। এটা বিনোদন লাভের অন্যতম একটি মাধ্যম। কিন্তু একজনের আনন্দ উপভোগ যেন অন্যের কষ্টের কারণ না হয়, সেদিকটায় লক্ষ রাখা একান্ত প্রয়োজন। প্রতিবছর খেলা দেখার জন্য বিভিন্ন স্থানে বড় বড় প্রজেক্টরের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে, যা প্রচণ্ড শব্দদূষণের সৃষ্টি করে বলে অভিযোগ আছে। একদিকে আমরা তীব্র শব্দদূষণ সৃষ্টি করে নিজেরা আনন্দ লাভ করছি, অন্যদিকে সেই শব্দ দুঃখজনকভাবে একজনের জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বাঁধাগ্রস্ত করছে।
আবার সমর্থিত দলের বিজয় উদযাপনের ক্ষেত্রেও দেখা যায় বিভিন্ন আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড। উচ্চশব্দের মাইক, ঢাক-ঢোলসহ রাস্তায় মিছিল করা থেকে শুরু করে নিষিদ্ধ আতশবাজির তীব্র শব্দে আলোড়িত হয়ে ওঠে গোটা দেশ। আমরা একবারও ভাবি না যে, আমাদের আনন্দ উদযাপনের এ ভুলপদ্ধতি আমাদের অনেক বড় ক্ষতির কারণ। আবার অনেক সময় দেখা যায়, সমর্থিত দল নিয়ে খুব সহজেই তর্কে লিপ্ত হয়ে যায় আমাদের যুবসমাজ।
এমন অপ্রয়োজনীয় তর্ক নিজেদের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি করে, আন্তঃব্যক্তি সম্পর্ক নষ্ট করে। এ তর্ককে কেন্দ্র করে কখনো কখনো ঘটে যায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা। আমাদের দেশে বিভিন্ন স্থানে দলীয় সমর্থকদের মধ্যে মারামারির ঘটনা বেশ কয়েকবার ঘটেছে। ঘটেছে হতাহতের ঘটনাও। সমর্থিত দল থাকবে, সেই দলের প্রতি ভালোবাসা, অকুন্ঠ সমর্থন থাকবে—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এটা নিয়ে তর্কে জড়িয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ তৈরি করাকে কোনো যুক্তিতেই সমর্থন করা যায় না। এক্ষেত্রে আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। খেলা উপভোগ করতে হবে আনন্দ লাভের জন্য, অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠার জন্য নয়। আবার পরাজিত দলের সমর্থকদের উস্কানি দিয়ে কথা বলা কিংবা উপহাস করার চর্চাও বেশ লক্ষণীয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক দলের সমর্থকরা অন্যদলের সমর্থকদের সরাসরি আক্রমণ করে, ব্যঙ্গ করে বিভিন্ন ধরনের স্ট্যাটাস দেয়। এসব ঘটনায় মারামারি থেকে শুরু করে খুনের ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। এই চিত্র কোনোভাবেই কাম্য নয়।
খেলায় দুটি দলের যে কোনো একটি দল পরাজিত হবে, এটাই স্বাভাবিক বিষয়। খেলায় অংশগ্রহণ, উপভোগ, কিংবা যে কোনো দলকে সমর্থন করার পূর্বে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা যেমন থাকতে হবে, ঠিক তেমনি পরাজিত দলকে বা সেই দলের সমর্থকদের নিয়ে উপহাস না করার মতো উদারতাও থাকতে হবে। কোনোভাবেই ভুলে গেলে চলবে না, খেলা আমাদের বিনোদনের উৎস, তাই এটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠা সম্পূর্ণ বোকামি। সুতরাং, খেলার জগতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এবং মিলেমিশে খেলার আনন্দ উদযাপন করতে সুন্দর, যৌক্তিক মানসিকতা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
