বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

কিশোর অপরাধ কি থামবে না?

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২২, ০০:৩০

অপরাধের নানা শাখা বাংলাদেশে বেড়েই চলেছে। নিয়ন্ত্রণ নেই অপরাধের, তাই থেমে নেই অপরাধ চক্রের কলাকৌশলও। বিশেষ করে কিশোর অপরাধ ব্যাপকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। প্রধানত ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে সারা দেশে বিস্তার করেছে কিশোর অপরাধ। আজ থেকে পাঁচ-সাত বছর আগেও বাংলাদেশের চিত্র এমন ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ থেকে সরে এসে নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে কিশোরেরা। বেশির ভাগই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধ করছে বলে অভিযোগ আছে। অভিভাবকেরাও যেন উদাসীন! সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে—এসবের ন্যূনতম খোঁজ নিচ্ছেন না তারা! কী অদ্ভুত কথা!

মনে রাখতে হবে, একজন অপরাধী কিশোরের অপরাধের দায় ভোগ করতে হচ্ছে পুরো পরিবারকে। আবার কিশোর অপরাধ আইন ও ধারার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বড় অন্যায় করেও পার পেয়ে যাচ্ছে অনেকে। ছাড়া পেয়ে আবার যুক্ত হচ্ছে নতুন অপরাধে। এভাবে চলতে থাকলে কিশোর অপরাধের শেষ হবে কীভাবে? দেশে তো মহামারির রূপ নেবে কিশোর অপরাধ!

সংবাদমাধ্যমে যাদেরই কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তারা বেশির ভাগই মাদক চোরাচালান, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার ও বহনের সঙ্গে জড়িত। এমনকি ভালো পরিবার থেকে উঠে আসা কিশোরেরাও নানা অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সন্তানের খোঁজ-খবর প্রথমত পরিবারকেই নিতে হয়। কিন্তু প্রযুক্তির যুগে অনেক অভিভাবক তাল মিলিয়ে চলতে না পারায় অনেক সময় সন্তানের খোঁজ-খবর নিতে পারছেন না। টিকটক আসক্তি থেকে গ্যাং তৈরি করা, অনলাইন গেম থেকে অস্ত্র চালনায় অনুপ্রাণিত হয়ে জঙ্গিগোষ্ঠীতে নাম লেখানোর মতো অভিযোগ আছে মেধাবী ও সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের বিরুদ্ধে। ক্রাইম প্যাট্রল দেখে হত্যাকাণ্ড শিখছে। কী সাংঘাতিক! 

সম্প্রতি চট্টগ্রামে শিশু আয়াতকে কতটা নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি। কিশোর গ্যাংয়ের হটস্পট এখন সারা দেশে। এই যখন অবস্থা, তখন প্রতিটি শান্তিকামী নাগরিক প্রত্যাশা করেন প্রশাসন কিশোর অপরাধ দমনে আরো বেশি সক্রিয় হলে কিশোর অপরাধ কমবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র তো ভিন্ন কথা বলে। কমিউনিটি পুলিশিং, বিট পুলিশিং সিস্টেম কোনো কিছুই যেন কাজে আসছে না! অথচ মাদক নির্মূল, কিশোর অবরাধ দমনের মতো অপরাধগুলোই এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছর বা এরকম বয়সি যেসব শিশু-কিশোরের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের জেলে না নিয়ে উন্নয়নকেন্দ্রে পাঠাতে হবে, যেন তারা সেখান থেকে সংশোধিত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। এখানেও পরিলক্ষিত হয় উল্টো চিত্র। অব্যবস্থাপনার জন্য নিরাময় কেন্দ্রেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে থাকে। প্রকৃতপক্ষে এসব নিয়ে সঠিক চিন্তাভাবনা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় কিশোর অপরাধ নীতিমালা আরো কঠোর করা প্রয়োজন বলে মনে করে বিশেষজ্ঞ মহল। 

সাধারণ মানুষের কাছে এখন আতঙ্কের নাম কিশোর অপরাধ—এতে কোনো সন্দেহ নেই। শহরে, গ্রামে কিশোরেরা শিক্ষক, বয়স্ক কাউকেই তোয়াক্কা করে না। তামাকদ্রব্যের সহজপ্রাপ্যতা কিশোরদের অপরাধ জগতের শুরুটা করে দিচ্ছে। স্থানীয় রাজনীতি, পদ-পদবির জন্য কিশোরেরা রাজনৈতিক নেতাদের অনুসারী হয়ে থাকে। এলাকাভিত্তিক দ্বন্দ্বে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। সুতরাং, এসব প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। কিশোর অপরাধ দমনে পরিবার, সমাজ, স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। প্রশাসনের নাকের ডগায় দিনে দিনে কিশোর অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে। ভুলে গেলে চলবে না, এখনই যদি কিশোর অপরাধ থামানো না যায়, সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুরা ভবিষ্যতে কী শিখবে?

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন