বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ করতে হবে

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২২, ০০:০৯

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আহত মানুষ বিভিন্ন জীবাণুতে আক্রান্ত হয়ে অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল। ১৯২৮ সালে স্যার আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং প্রথম জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেন। সেই থেকে একের পর এক অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার হয়। মানুষ প্লেগ, যক্ষ্মা, ধনুষ্টংকারের মতো কঠিন কঠিন রোগ থেকে মুক্তি পায়। রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর আক্রমণ ঠেকাতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বর্ণযুগের সূচনা করে—এ কথা বলাইবাহুল্য। কিন্তু আজকের যুগে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছা ব্যবহারে এক প্রকার অনিশ্চয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। 

অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভালো হওয়া যায়। অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের কিছু নিয়ম রয়েছে এবং কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করে অ্যান্টিবায়োটিক ভিন্ন ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় কোনো এক অ্যান্টিবায়োটিকে অসুখ সেরে গেলে সেই একই অ্যান্টিবায়োটিক অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়, যার ফলে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না ঠিকমতো। আবার ভাইরাসজনিত কোনো অসুখ-বিসুখে—যেসব ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে রোগ হয়তো এমনিতেই সেরে যেত—অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে পরবর্তীকালে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ভুল অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে করতে এবং সঠিক নিয়মে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন না করার কারণে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হয় অর্থাৎ যার মানে হলো অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। এর ফলে এক সময় রোগী সুপারবাগ সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন। এর অর্থ, অ্যান্টিবায়োটিক তার ওপর আর কাজ করবে না। কী সাংঘাতিক বিষয়!

মনে রাখতে হবে, সব অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার কতটা বিপজ্জনক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করার জন্যে রোগীর মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা থাকে না। শুধু অধিক সময় ধরে তথা যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে অকালে ঝরে যায় অসংখ্য জীবন। পরিস্থিতি এমন—চিকিৎসক আছেন, অর্থ আছে, ওষুধও আছে, শুধু অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে তখন কারো কিছুই করার থাকে না। 

বর্তমান বিশ্বে খাদ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রোটিন ও আমিষের চাহিদা বাড়ছে। সেই সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার মারাত্মকভাবে বাড়ছে। পশুপাখির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি রোগ প্রতিরোধ বা প্রতিকারের জন্য পশুর জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার অত্যাবশ্যকীয় হয়েই থাকে, সেক্ষেত্রে তা শেষ না হওয়া অবধি ঐ প্রাণীর ডিম, দুধ বা মাংস খাওয়া বা বাজারজাত করা যাবে না। অথচ কম খরচে লাভবান হওয়া যায় বলে একশ্রেণির মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী গরু, হাঁস, মুরগি নীরোগ রাখতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার করে থাকেন। এমনকি মাছের খাবারেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। কৃষিতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এতটাই বেড়েছে যে, খাদ্যসহ দুগ্ধজাত পণ্যেও এখন অ্যান্টিবায়োটিক ছড়িয়ে পড়েছে। যার ফলে খাবারের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের শরীরে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।  

একদিকে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষ ও প্রাণিদেহে থাকা অণুজীবকে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট হতে সাহায্য করছে, অন্যদিকে কৃষিতে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক চারপাশের জলাশয়কে দূষিত করেছে। এসব অ্যান্টিবায়োটিক মাটি ও পানিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া ও অণুজীবকে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট করে তুলছে। আর এভাবেই একটি সাধারণ জীবাণু বহুবিধ অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। যখন কোনো ব্যাকটেরিয়া বা সহজ অর্থে রোগের জীবাণু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে কার্যকর সব ওষুধ প্রতিরোধে সক্ষম হয়ে ওঠে, তখন সেটিকে সুপারবাগ বলা হয়। সুপারবাগ ইনফেকশন এখন নীরব মহামারি হয়ে উঠছে বিশ্বজুড়ে। আমাদের দেশে প্রতি বছর সুপারবাগ সংক্রমণের কারণে অনেক মানুষ মারা যায়। কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করায় এই সুপারবাগে ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে প্রাণ গেছে প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘আইসিইউতে থাকা প্রতি ১০ জনে ছয় জন রোগীই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্টে আক্রান্ত। পরিস্থিতি এতটাই ভয়ানক যে, কিছু রোগীর চিকিৎসার আর কোনো পথই খোলা থাকে না।’  কী ভয়াবহ ব্যাপার!

অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো অবস্থাতেই বিক্রি করার নিয়ম নেই। অথচ আমাদের দেশে চাওয়া মাত্রই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয় করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে ২০৫০ সালে করোনা ভাইরাসের চেয়ে বেশি সংকটে পড়বে দেশ। এ ভয়ংকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো অ্যান্টিবায়োটিকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। আর এটি সম্ভব সচেতনতার মাধ্যমে । 

যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সম্বন্ধে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই সচেতন না। যার জন্যে আমাদের দেশে দেখা যায়, রোগী নিজেই ফার্মাসি থেকে ইচ্ছামতো অ্যান্টিবায়োটিক কিনে সেবন করে। আর কড়াকড়ি না থাকার জন্যে দোকানিও বিক্রি করেন অবলীলায়। তাই নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো ওষুধের দোকানি যেন অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রি করতে না পারে, এ জন্যে প্রয়োজনীয় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থাপত্র ও ফুল ডোজ  ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে হবে। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে আইন করেও এটা রোধ করা সম্ভব হবে না, যদি না জনগণ নিজ ইচ্ছায় কেনা থেকে বিরত থাকে। এ জন্যে জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। গণমাধ্যমগুলোতে এ সংক্রান্ত সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার, বিভিন্ন কর্মসূচি, বিদ্যালয়গুলোতে কর্মশালা, গ্রাম পর্যায়ে সচেতনতার জন্য মাসিক বা সাপ্তাহিক আলোচনাসভা প্রভৃতি করা যেতে পারে। শুধু সচেতনতাই পারে অ্যান্টিবায়োটিকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে। একই সঙ্গে ইচ্ছামতো অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া এবং প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। সত্যিকার অর্থেই, আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছা ব্যবহারের লাগাম টানা সময়ের দাবি।  

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন