রোববার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২২ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সিটবেল্ট বাঁধিতে হইবে শক্ত করিয়া

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২২, ০১:১৫

মাসখানেক পূর্বে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একটি সম্মেলনে বিশ্বের ১৯০টি দেশের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করিয়া বলিয়াছেন—শক্ত করিয়া সিটবেল্ট বাঁধিতে হইবে। কারণ, মহামারির পর হইতে সমগ্র পৃথিবীর অর্থনীতি ‘স্লো ডাউন’ হইয়াছে। অর্থাৎ আয়, কর্মসংস্থান, নিয়োগ, বিনিয়োগ, উৎপাদন—সকল কিছুই হ্রাস পাইতেছে। আমরা ইতিপূর্বে এই বিষয়ে একাধিকবার লিখিয়াছি, হালনাগাদ চিত্র প্রকাশের ভিতর দিয়া বুঝিতে ও বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছি—কোন পথে চলিতেছে এই বিশ্ব। ইউক্রেন আক্রমণের জের ধরিয়া আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস, তৈল ও খাদ্যশস্যের মূল্য বাড়িয়াই চলিতেছে।

স্বাভাবিকভাবেই আমদানিনির্ভর দেশগুলি অধিক বেকায়দায় পড়িয়াছে। মূল্যস্ফীতির ঘোড়া এখন পাগলা হইয়া গিয়াছে; কিন্তু যতই খারাপ অবস্থা আসুক—সাধারণ মানুষকে তো খাইয়া-পরিয়া কোনোভাবে প্রাণধারণ করিতে হইবে। তাহারা এত কিছু বুঝিতে চাহে না। তাহারা চক্ষু মেলিয়া বিশ্বটাকেও দেখিতে চাহে না। ভুখা মানুষের অন্তর্দৃষ্টি থাকে না—তাহারা কেবল ক্ষুধা বুঝে। আসলে, গলা পর্যন্ত ডুবিবার পর কোনোভাবে নাক ভাসাইয়া বাঁচিয়া থাকিতে কাহারোই ভালো লাগে না; কিন্তু করণীয় কী? পরাশক্তির অর্থনীতির দেশগুলির অর্থনীতিবিদরা বলিয়া থাকেন—অর্থনীতির চাকা না ঘুরিলে উৎপাদন ব্যাহত হইবে, তাহাতে কর্মী ছাঁটাই হইবে। ইহাতে বেকারত্ব বাড়িলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাইবে, তাহাতে বিক্রি কম হইবে অর্থাৎ চাহিদাও হ্রাস পাইবে, ফলে উৎপাদন কমিতে থাকিবে এবং এই চক্রে পড়িয়া কাদায় গাঁথিয়া যাইবে অর্থনীতির চাকা। আর তখন সেই চাকাকে তুলিতে হইলে জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্মের মতো গাড়োয়ানকে কাদায় নামিয়া সর্বশক্তি দিয়া চাকা ঠেলিয়া তুলিতে হইবে।

স্পষ্টতই কাজটি অত্যন্ত পরিশ্রমের। অর্থাৎ এখনই অতিরিক্ত পরিশ্রম করিবার সময়। না হইলে চাকা উঠিবে না। নূতন করিয়া শক্ত জমিনে দাঁড়াইতে পারিবে না; কিন্তু আমরা দেখিতে পাইতেছি, সমস্যায় পড়িয়া সকলে কেবল অভিযোগের তির ছুড়িতেছে। কেবল উন্নয়নশীল বিশ্বেই নহে, পৃথিবীময় অভিযোগের পাহাড় জমিয়া উঠিতেছে। পৃথিবীময় সকল দেশের সরকার হিমশিম খাইতেছে এই সংকটকে প্রশমিত করিতে, একটুখানি স্বস্তির সহিত সামলাইতে; কিন্তু তাহার পরও পরিস্থিতি বাগে আনা যাইতেছে না; কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে আমাদের মনেও প্রশ্ন জাগে—যাহারা সমালোচনা করিতেছেন এই সমস্যা হইতে উত্তরণের জন্য, তাহাদের কি জানা আছে কোনো ম্যাজিক দাওয়াই? নাকি তাহারা ঘোলা জলে মাছ শিকার করিতেই সমালোচনার কার্ড খেলিতেছেন? তথ্যপ্রযুক্তির এই অবারিত তথ্য বিস্ফোরণের যুগে সাধারণ মানুষ নিশ্চয়ই ক্রমান্বয়ে দেখিতেছেন, বুঝিতেছেন সমগ্র বিশ্বের কী অবস্থা। বিশ্ব তো এখন বিশ্বগ্রাম। সুতরাং এই বিশ্বগ্রামে ঝড় উঠিলে তাহার ঝাপটা সকলকেই পাইতে হয়। বিশেষ করিয়া অর্থনীতির ঝড়। কারণ সমগ্র পৃথিবীর অর্থনীতি বিনি সুতায় একে-অন্যের সহিত গাঁথিয়া রহিয়াছে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র। তাহাদের শ্রম বিভাগ সম্প্রতি জানাইয়াছে—সর্বশেষ মে মাসে গত বৎসরের একই সময়ের তুলনায় খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশ ও জ্বালানির দাম ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। সেই দেশে ১৯৮১ সালের পর এতটা মূল্যস্ফীতি আর দেখা যায় নাই। উন্নত দেশগুলির মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ৮ দশমিক ১ শতাংশ। নিউজিল্যান্ডে ২২, তুরস্কে ২৪, আর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ৪০ বত্সরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। সুতরাং হাতি ঘোড়া গেল তল, আমরা কী করিয়া বলিব—কত জল? বরং আমাদের দুশ্চিন্তা আরো এক ধাপ অধিক। ধরা যাউক, আগামীকাল হইতে পরিস্থিতি সর্বোচ্চ খারাপ হইতে ক্রমশ ভালো অবস্থার দিকে উঠিতে থাকিল; কিন্তু এতদিন ধরিয়া যেই বিপুল ও বিশাল ক্ষতি হইয়াছে—তাহার ক্ষতি ঠিক হইতে কয়টি দশক পার করিতে হইবে—তাহা কোনো অর্থনীতিবিদই স্পষ্ট করিয়া জানেন না। জানিবার মতো গবেষণাও নাই। সুতরাং সমগ্র বিশ্বেরই পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। এই অবস্থায় মনে মনে জিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন—আমি যদি দায়িত্বে থাকিতাম তাহা হইলে কী করিতে পারিতাম? বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়া যাইবার সময় শক্ত করিয়া সিটবেল্ট বাঁধিতে হয়। শুধু সমালোচনা নহে, সিটবেল্টটাও শক্ত করিয়া বাঁধা চাই।

 

 

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন