শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩, ১৩ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২২, ০৩:০১

প্রকল্প গ্রহণে ত্রুটির কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চার বছরের স্থলে আট বছরে উন্নীত হয়েছে। ৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকায়। প্রকল্পের সময় ও অর্থ ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনদুর্ভোগও প্রলম্বিত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম শহরের বিমানবন্দর থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত একমাত্র লাইফ লাইন খ্যাত সড়কের প্রায় ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন উক্ত এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ ২০১৭ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। চার বছর মেয়াদি প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পটির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদার নিয়োগ পরবর্তী প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের জুন মাসে থেকে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্প গ্রহণে তাড়াহুড়ো এবং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ত্রুটির কারণে প্রকল্পের সময়, অর্থ ও জনগণের কষ্ট ও দুর্ভোগ সীমাহীন অবস্থায় পৌঁছেছে। প্রকল্প গ্রহণে ত্রুটির কারণে এক্সপ্রেসওয়ের এলাইনমেন্ট, ডিজাইন-ড্রয়িং ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করতে হয়েছে। সমস্যাগুলো পূর্বে চিহ্নিত না করে কাজ শুরু হওয়ার পর দুর্বলতাগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ায় ধারাবাহিক কাজের ক্ষেত্রে মন্থরগতি লক্ষ্য করা যায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এক্সপ্রেসওয়েটি মূল সড়কের ওপর দিয়ে নির্মাণের কারণে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতার উদ্ভব হয়। তাছাড়া বিদ্যুৎ বিভাগ, ওয়াসা, রেলওয়েসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার ত্বরিত সহযোগিতায় ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্প প্রলম্বিত হচ্ছে। প্রকল্প গ্রহণের সময় সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের সঙ্গে বৈঠক করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে প্রকল্পের মধ্যে এসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতো না বলে বিভিন্ন সংস্থার ব্যক্তিবর্গ অভিমত ব্যক্ত করেন। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২০ সালে সম্পন্ন হলেও এর আর্থিক ও সময় বৃদ্ধির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করে ৪ হাজার ৮ কোটি টাকা এবং সময় নির্ধারণ করা হয় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।

প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় বৃদ্ধিতে দীর্ঘসূত্রতা, সহকারের অর্থ ছাড়ে ধীরগতি এবং সর্বোপরি সিডিএ কর্তৃক সাইট যথাসময়ে বুঝিয়ে দিতে না পারার অজুহাতে ঠিকাদারও তার কাজের গতি কমিয়ে দেয়। দেশের ম্যাক্স ও বিদেশি একটি যৌথ প্রতিষ্ঠানের যৌথ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান প্রথম থেকে নির্মাণস্থলের উভয় পাশে সড়ক চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য রাস্তার সংস্কারকাজ যথাযথভাবে করার চুক্তি থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। ফলে যান চলাচল যেমন ব্যাহত হয়েছে, একই সঙ্গে সড়ক পাশের ঘরবাড়ি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের লক্ষ্য হলো চট্টগ্রাম শহর এলাকা ও এর দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করা। চট্টগ্রাম শহরের মধ্যে স্থিত সিইপিজেড কর্ণফুলী ইপিজেডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন। চট্টগ্রাম শহর কেন্দ্রে এমন দূরত্ব ও ভ্রমণ সময় হ্রাসকরণ এবং বিদ্যমান যানজট নিরসন। বিমানবন্দরে যাতায়াত সহজীকরণ এবং কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিতব্য বঙ্গবন্ধু টানেলের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান জানান, প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ত্রুটি ছিল। তাছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে এসে নতুন নতুন সমস্যা দেখা যায়। তিনি জানান, বিদ্যুতের পোল, ওভারহেড, লাইন সরাতে গিয়ে বেশি সময় ও অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে। বিদ্যুতের লাইন ও পোল স্থানান্তরে অতিরিক্ত ২২০ কোটি টাকা এবং এলাইনমেন্ট পরিবর্তনে ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম ওয়াসাকে টাকা পরিশোধ করার পরও বারিক বিল্ডিং থেকে কাস্টমস মোড় পর্যন্ত পানির লাইন সরানো যায়নি। চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য পরিবহনের বিভিন্ন গেট সম্মুখ দিয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে যাওয়ার ফলে যানবাহন ও পণ্য পরিবহনবাহী ট্রাক, লরির বিকল্প সড়ক সাগর পাড়স্থ রিং রোড প্রকল্পের কাজ সম্পন্নের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। দেওয়ানহাট হতে টাইগারপাস পর্যন্ত প্রায় ১ কিলোমিটার অংশে ঢাকা-চট্টগ্রামের ছয় ট্রেকবিশিষ্ট মেইন রেললাইন থাকায় বিদ্যমান রেললাইনের ওপর সর্বনিম্ন সাড়ে ৮ মিটার উচ্চতা রেখে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ করার অনুমতি অদ্যাবধি পাওয়া যায়নি। তাছাড়া দেওয়ানহাট থেকে টাইগারপাস জংশন পর্যন্ত রেলের প্রায় ৭০ শতক জায়গা, লালখান বাজারস্থ ২৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটেলিয়নের সীমানাপ্রাচীরের ভেতর ৯ দশমিক ৭৬ শতক জায়গা এবং জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের প্রায় ১৩ শতক জায়গা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এখনো সিডিএর নিকট হস্তান্তর করার বিষয়ে অনুমতি পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত ১৫ দশমিক ২০ কিলোমিটার ফ্লাইওভারের কাজ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কয়েকটি অংশে ভাগ করে কাজ করছে। আবার অনেক জায়গায় আংশিক কাজ করার পর দেখা যায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। সড়ক মাঝে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাস্তা লন্ডভন্ড হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সড়কে খানা-খন্দকের কারণে যানবাহন চলাচল মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে দেখা যায়। সড়ক পাশের বাসাবাড়ি, দোকানপাট অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে পড়ে যায়। শীতের ধুলাবালি এবং বর্ষায় কর্দমাক্ত সড়কের কারণে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে লোকজন। দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য তলানিতে পড়ে যায়। সেই ২০১৭ সাল থেকে এই ১৬ কিলোমিটার সড়ক পাশের বাসিন্দা ও যাতায়াতকারী যানবাহনের জটে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়ক দুই পাশে চট্টগ্রাম বন্দর সিইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেড, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, বহু গার্মেন্টস, পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ কয়েকটি বেসরকারি তেল স্থাপনা, অসংখ্য ছোট-বড় শিল্প স্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, আবাসিক এলাকা তথা নগরীর প্রায় অর্ধেক জনবসতির মানুষ যাতায়াত ও বসবাস করে থাকে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ কী পয়েন্ট ইন্সটলেশন (কেপিআই) সমূহ অবস্থিত। গুরুত্বপূর্ণ এলাকার এক প্রকার মধ্য দিয়ে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলায় জন-যান চলাচলে এক দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে মানুষ। চার বছরের প্রকল্প মেয়াদ আরো চার বছর বাড়িয়ে আগামী ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। উক্ত সময়ের মধ্যেও কাজ সম্পন্ন হবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

ইত্তেফাক/ইআ