বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দারিদ্র্যকে পাশ কাটিয়ে এসডিজি অর্জন সম্ভব নয়

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:১০

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় দারিদ্র্য দূরীকরণ অন্যতম লক্ষ্য। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টি মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। এই ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার প্রধান হলো দারিদ্র্য দূরীকরণ। বলা বাহুল্য, বৈশ্বিক নানা সংকটের যাঁতাকলে পড়ে বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও দারিদ্র্য দূরীকরণ অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য দূর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে।

সাধারণভাবে দারিদ্র্য বলতে আমরা বুঝি—বেঁচে থাকা এবং অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন মেটানোর জন্য আমাদের অধীনে যতটুকু সম্পদ বা আয়ের প্রয়োজন তার অপর্যাপ্ততাকে। দারিদ্র্যের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উপাদান থাকতে পারে। বিভিন্ন কারণে দারিদ্র্য সৃষ্টি হয়ে থাকে; যেমন—স্থানীয় দুর্নীতি, আইনগত ত্রুটি, সরকারের যথাযথ পদক্ষেপের অভাব, দেশের ভৌগোলিক ও জনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি। মানতেই হবে, যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের টেকসই উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হলো দারিদ্র্যতা। দারিদ্র্যকে সঙ্গে নিয়ে কোনো দেশের যথাযথ উন্নয়ন সম্ভব নয়। দারিদ্র্য বিলোপ করতে না পারলে দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মানও উন্নয়ন হবে না স্বাভাবিকভাবে। আর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন না হলে তাদের কর্মক্ষমতা থেকে শুরু করে অন্যান্য দক্ষতা অর্জনও সম্ভব হবে না। ফলে তারা নিজেদেরকে মানবসম্পদে পরিণত করতে পারবে না সহজেই। এসবের অভিঘাতে দেশের মাথাপিছু আয় কমে যাবে। আর আসল পরিস্থিতি সামনে আসবে তখনই! কেননা, মাথাপিছু আয় কমে গেলে কোনো দেশের পক্ষেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। অর্থাৎ এক কথায় বললে, দারিদ্র্য বহুমুখী সমস্যা সৃষ্টি করার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। তাই যত দ্রুত সম্ভব দারিদ্র্য নির্মূল করা এখন সময়ের দাবি।

আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাই, একটি গবেষণা অনুসারে, করোনায় কর্মহীন মানুষের সংখ্যা লক্ষণীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সাধারণ মানুষের আয় হ্রাস পেয়েছে। ফলে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ শতাংশে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অতি-দারিদ্র্য। ৯ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে তিন গুণ বেড়ে তা হয়েছে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। 

বাংলাদেশের মতো এমন একটি জনবহুল দেশে জনগণের তুলনায় কর্মক্ষেত্রের প্রচুর অভাব রয়েছে। সেই সঙ্গে জনগণের নেই যথেষ্ট দক্ষতা। ফলে বিশ্বের চাকরির দরবারেও তারা রয়েছে পিছিয়ে। দারিদ্র্য কোনো একটি স্বতন্ত্র সমস্যা নয়। এর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে হাজারো সমস্যা। 
এসব সমস্যা একটি অপরটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সময়ের ব্যবধানে যদিও দারিদ্র্যতা কিছুটা কমেছে তবে কলকারখানার শ্রমিক ও কৃষি শ্রমিকের সংকট চোখে পড়ার মতো। প্রতি বছর যদিও মোট জনসংখ্যার একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে পারি জমাচ্ছে, কিন্তু উপযুক্ত দক্ষতার অভাবে সেখানেও তাদের স্বল্প বেতনে কাজ করতে হচ্ছে। এই চিত্র অত্যন্ত পরিতাপের।

সরকার যদি কারিগরি শিক্ষার ওপর যথেষ্ট জোর দেয় এবং দক্ষ মানবসম্পদ যদি গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তাহলে প্রবাসী রেমিট্যান্সের পরিমাণ যেমন একদিকে বেড়ে যাবে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিও মজবুত হবে। দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব হচ্ছে দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ। যার ফলে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান কমার বদলে শুধু বাড়ছেই। দুর্নীতি, লুটপাট, ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধানকে ত্বরান্বিত করে, যা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়া যেসব জনগোষ্ঠী নিচু অঞ্চলে বসবাস করে প্রতি বছর বন্যায় তাদের জীবনের চিত্রই বদলে যায়। এই জনগোষ্ঠীরও একটা নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্রতার শিকার। সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যও দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ। সুশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থা ও ধনী-গরিবের বৈষম্য নিরসনের মাধ্যমে দারিদ্র্য অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার মাধ্যমেও দারিদ্র্য কমিয়ে আনা যায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কর্মমুখী শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা প্রদানের মাধ্যমে জনগণকে মানবসম্পদে পরিণত করা যায়—এই বিষয়টি ভালোভাবে মাথায় রাখতে হবে। এতে করে নিশ্চিতভাবে রেমিট্যান্সের একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। কলকারখানায় শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে হবে। সরকারি চাকরির আশায় বসে না থেকে আত্মকর্মসংস্থানের দিকে দেশের তরুণ প্রজন্মের ঝোঁক কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয়ে ভাবতে হবে। 

রবার্ট বার্টন একটি কথা বলেছিলেন, ‘দরিদ্রদের নিয়ে ভাবে অনেকে কিন্তু তাদের জন্য কিছু করে খুব স্বল্পসংখ্যক লোক।’ দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে তার এই কথাটিকে আমাদের মিথ্যা প্রমাণ করতেই হবে। আমরা যে যেই অবস্থানেই থাকি না কেন, সেখান থেকে একে অপরের প্রতি সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব প্রদর্শন করতে হবে। দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকার সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণে আরো বেশি আন্তরিক হবেন বলেই আমরা প্রত্যাশা করি। সর্বোপরি সবাইকে সচেতন থেকে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের লড়াইয়ে জিততে হবে। মনে রাখতে হবে, দারিদ্র্য দূরীকরণ করতে পারলেই কেবল টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। দারিদ্র্য দূরীকরণকে পাশ কাটিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চিন্তা করাটা হবে বড় ধরনের বোকামি। 

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন