নান্দনিক বিয়ের পোশাক

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ১৩:২৬

লীলাবালি লীলাবালি/ভর যুবতী সই গো/
ভর যুবতী সই গো কী দিয়া সাজাইমু তরে...

গানের সঙ্গে চলছে বিয়ের মৌসুম। বিয়ে ছেলে-মেয়ের জীবনের এক বিশেষ সময়। বিশেষ এই অধ্যায়ে পানচিনি, গায়ে হলুদ, বিয়ে, বৌভাতসহ নানা ধরনের আনুষ্ঠানিকতা থাকে। বিয়ে দুটি হৃদয়ের মেলবন্ধনের পাশাপাশি উত্সব। উত্সব মানেই পোশাকে প্রাধান্য। বিয়ের পোশাকেও রয়েছে আমাদের কিছু ঐতিহ্য আছে বৈশিষ্ট্য। থিম-ভিত্তিক সাজের চল এখন। তাই পোশাকের রং আর ধরন নির্বাচন করা হয় অনুষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী। সময়ের পালাবদলে বর্তমানে বিয়ের ফ্যাশনেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। বর্তমানে বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই সাজসজ্জা আর পোশাক-আশাকে আভিজাত্য প্রকাশ। একেক জাতি কিংবা একেক ধর্মাবলম্বী একেক স্টাইলে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে থাকলেও উৎসবের আমেজ যেন একই। 

সঙ্গত কারণেই তিনটি উৎসবের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন রকমের। মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। আর এ সচেতনতার প্রভাব পড়েছে বিয়ে-শাদিতে। পান-চিনি, গায়ে হলুদ, বিয়ে, বউ-ভাতের দিন আলাদা আলাদা শাড়ি পরেন কনেরা।

মডেল: পূজা চেরি। পোশাক: বিশ্বরঙ

মধ্যমণি হয়ে ওঠে কনে। এ ক্ষেত্রে সবার নজর থাকে কনের সাজের দিকে। কী শাড়ি পরল, রং-ম্যাটেরিয়াল কেমন, শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ, ওড়না মানানসই হয়েছে কি না-এমন নানান ধরনের জল্পনা কল্পনা থাকে সবার মাঝে। কনে সাধারণত তিন অনুষ্ঠানে তিন ধরনের পোশাকে সাজে। মেহেন্দি, হলদি, বিয়ে, রিসেপশন তো প্রচলিতই। আগে যেমন বাঙালি বিয়ে সীমাবদ্ধ ছিল বিয়ে আর বৌ-ভাতের মধ্যেই। কিন্তু  এখন গায়ে হলুদ, বিয়ে এবং বৌ-ভাতের সাজ একেক স্টাইলের হয়ে থাকে। কোনোটার সঙ্গে কোনোটার মিল নেই।

শাড়ি ছাড়া বিয়ে কখনো কল্পনাও করা যায় না। তাই বিয়েতে পোশাকের তালিকায় সর্বপ্রথম প্রাধান্য পায় শাড়ি। যুগ পরিবর্তনের হাওয়া অনেক জায়গায় লাগলেও এখনো বিয়ের জন্য বাঙালি মেয়েদের প্রথম পছন্দ শাড়ি। তবে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে শাড়িই সবচেয়ে মানানসই। সুতির পাশাপাশি টাঙ্গাইল হাফ সিল্ক বা সফট সিল্ক নিতে পারেন। আর জামদানি তো আছেই। আবার শাড়িতে  নিজের পছন্দমতো কমলা, গাঢ় সবুজ, কাঁচা মেহেদি, হালকা বেগুনি পাড় লাগিয়ে নিতে পারেন। এতে আরও গর্জিয়াস দেখাবে।

বিয়ের দিন মসলিন, জামদানি, জর্জেট, কাতান, বাহারি ডিজাইনের শাড়ি বেছে নিতে পারেন। বেনারসি বিয়ের শাড়ি হিসেবে সব থেকে বিখ্যাত। জর্জেট শাড়িতে এমব্রয়ডারি, ডলার, লেসের কাজ দিয়ে বৈচিত্র্য আনা হয়। ফ্যাশনেবল, ট্রেন্ডি হালকা কাজ করা শাড়ি বৌ-ভাতে উপযুক্ত পোশাক হতে পারে। কনেরাও এখন বিয়ের সাজে দেশি শাড়ি পরছেন। দেশীয় পোশাকে বিয়ে করা মানে নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরা সবার সামনে। আমাদের জামদানি শাড়ির তো আগে থেকেই একটা অভিজাত ভাব আছে। এ জন্য বিয়েতে বেশির ভাগ কনের পছন্দের শীর্ষে থাকে। বিয়েতে লেহেঙ্গা খুব ট্রেন্ডি। বিয়ে না হয় বৌ-ভাত অনুষ্ঠানে অনেকেই লেহেঙ্গা পরছেন। ব্লাউজের সঙ্গে স্কার্টের কম্বিনেশন মিলিয়ে বিয়ের লেহেঙ্গায় থাকছে আলাদা চমক।

প্রাচীনকাল থেকেই বিয়েতে মেয়েদের বিয়ের পোশাকে লাল রংকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু এখন শুধু লাল রং নয় বিভিন্ন হালকা ও ভিন্নধর্মী রঙের বিয়ের শাড়ি, লেহেঙ্গা পড়ছেন। সবুজ, গোলাপি, নীল এমনকি কালোও জায়গা করে নিয়েছে। ফলে বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে কালার প্যালেটে। গোল্ডেন, সফট পিংক, পিচ রয়েছে সাদাও। বিয়েতে বরের পোশাক নিয়েও বেশ আলোচনা হয়। গায়ে  হলুদে রয়েছে হলুদ রঙা পাঞ্জাবিতে হালকা সুতার অথবা সবুজ, বেগুনি, কাঁচা মেহেন্দি, মেরুন  রঙের পোশাক। বরের পোশাকের মধ্যে শেরোয়ানি সব থেকে বেশি প্রচলিত। বিয়ের প্রধান পোশাক হিসেবে শেরোয়ানিই বেছে নেন বর। ভারী কারুকাজের সঙ্গে সঙ্গে শেরোয়ানিটা একটু দামি কাপড়ের হতে হয়। তাই শেরোয়ানি কেনার সময় রং ও ডিজাইনের ক্ষেত্রে বেশি খেয়াল রাখতে হয়। অফহোয়াইট কিংবা হালকা গোল্ডেন শেরোয়ানি বেশি দেখা যায়। তাছাড়া নীল, বাদামি, লাল, গোলাপি, সবুজ, শেরওয়ানি পড়েন অনেকেই। পাগড়ি হতে পারে লাল, মেজেন্টা বা কাছাকাছি কোনো রঙের। তবে আবার অনেকে বৌ-ভাত বা রিসিপশনে কনের সঙ্গে মিল রেখে পাঞ্জাবি পরেন। অনেকে আবার ব্লেজার, কমপ্লিট সেটকেও প্রাধান্য দেন।

আমাদের সনাতন বিয়েতে রয়েছে পাটিপত্র, পানখিল, দধি মঙ্গল, গায়ে হলুদ, শঙ্খ, কঙ্কন, বর বরণ, সাত পাক বা সপ্তপদী, শুভদৃষ্টি, মালা বদল, সম্প্রদান, অঞ্জলি সিঁদুর দান, বউভাত আচার-অনুষ্ঠান। বাগদান অনুষ্ঠানে পাটিপত্র করা হয়। এরপর আশীর্বাদ আসর। দুর্বা, প্রদীপ, চন্দন, পান, সুপারি ও বড় মাছ দিয়ে আশীর্বাদ করা হয়। প্রত্যেকটি পর্বে রয়েছে নিজস্ব আয়োজন।

বিয়ের পোশাকে ফ্যাশন হাউজ বিশ্বরঙ বরাবরের মতো দেশীয় মোটিফ নিয়ে কাজ করছে। দেশে ইতিহাস এবং ঐতিহ্য আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে তারা বদ্ধপরিকর।

বিশ্বরঙের কর্ণধার ও ফ্যাশন ডিজাইনার বিপ্লব সাহা মনে করেন, বিয়ের শাড়ি দেশীয় উপাদানে নজরকাড়া, নান্দনিক আর ঐতিহ্যবাহী হওয়া উচিত। তাই তো বিয়ের আয়োজনের বৈচিত্র্য পোশাকে আর উদযাপনের নান্দনিকতা  তিনি ব্যবহার করেছেন একেবারে দেশি কাপড়। রাজশাহী সিল্ক, জামদানি, মিরপুরের বেনারসি, কাতান ও টাঙ্গাইলের কাপড়। ছেলেদের শেরোয়ানি ও পাঞ্জাবিতে রয়েছে গাঢ় রঙের ছোঁয়া। নকশায় দেশি মেটেরিয়াল দিয়ে তিনি শাড়ি হলুদ রঙের মধ্যে সিলভার কালার জরি সুতার পেটানো নকশা, সবুজ কাতানের মাঝে কারুকাজ করা সাথে আছে দেশি কাতান, জামদানি, সিল্ক, মসলিন, নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী ডিজাইন করা শাড়ি।

মডেল: অপু বিশ্বাস ও নিরব। পোশাক: বিশ্বরঙ 

তিনি আরও জানান, বেনারসি শাড়ির ডিজাইন আগের চেয়ে উন্নত ও বৈচিত্র্যময়। তবে পুরনো ডিজাইনের কদর কমেনি। হ্যান্ডলুম সিল্ক, কাতানের ওপর কুন্দন, চুমকির নকশা, শাড়ি বাঙালি ঐতিহ্য এবং বাঙালি বধূ সাজের পূর্ণতা আনে। এখনকার বিয়েতে আমরা আমাদের পুরানো রীতিগুলো ভুলতে বসেছি। সেই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে নিরলস কাজ করছে বিশ্বরঙ।

দেশীয় শাড়ির ঐতিহ্য ও আভিজাত্য বাঙালি বধূর সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলে বহুগুণে। লাল, সবুজ, গাঢ় রঙের শাড়ি পরা আমাদের বিয়ের ঐতিহ্যের অংশ।  বর্তমান প্রেক্ষাপটে লোকজ ঐতিহ্য আর এর পরম্পরার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

বিভিন্ন শাড়ির সাথে ভেলভেটের বোট নেক, জেট নেক, গোল গলার কোমর পর্যন্ত লম্বা ব্লাউজ বেশ মানানসই। ছোট হাতার পাশাপাশি কনে সাজেও এখন ফুলহাতা কিংবা থ্রি-কোয়ার্টার হাতার ব্লাউজ, প্যাচওয়ার্কের ব্লাউজ চলছে। সঙ্গে জর্জেট কিংবা জামদানির ওড়না গর্জিয়াস লুক আনবে। সনাতন বিয়েতে ধুতি কুর্তা পরলে নিজের শেকড়কে সম্মান জানানো হয় না। হিন্দু বিয়ের সময় তো বাঙালিদের টোপর পরেই বিয়ে করতে হয়। তাছাড়া আজকাল পাঞ্জাবি, ঢোলা পাজামা, ধুতি, সালোয়ার ছাড়াও সঙ্গে থাকে চাদর। সবই পেয়ে যাবেন বিশ্বরঙে।

ইত্তেফাক/এআই