নারী হোক বিজয়ী

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:১৩

জয়ের সম্যক শব্দ বিজয়। আমাদের সমাজে জয় এবং বিজয় সমান হিসেবে ধরা হলেও নারী ও পুরুষকে সমান ভাবে ধরা হয় না। গ্রামীণ পর্যায় থেকে শুরু করে শহুরে জীবনেও নারী যেন এক পরিত্যক্ত বস্তু! আজকের দিনেও গ্রামীণ জীবনে পুরুষের সঙ্গে জমি কর্ষণ থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত নারীর বিরাম নেই। পাশাপাশি ঘরকন্নার কাজ তো আছেই। গ্রামীণ সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, পুরুষ মাঠ থেকে পরিশ্রম করে ঘরে ফিরে খাবার পেতে একটু দেরি হলে স্ত্রীর সঙ্গে তুমুল ঝগড়া শুরু করে। আর উপহার স্বরূপ তো বেত্রাঘাত আছেই! এত গেল গ্রামীণ দৃশ্য। শহুরে নারীর দৃশ্যটা আরো বেশি মর্মান্তিক। 

স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে ভাগ্যকে অনুসন্ধান করার জন্যই শহরে আসে গ্রামীণ নারী। নারীর কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেশ জনপ্রিয় গার্মেন্টস কারখানা তথা পোশাকশিল্প। এ শিল্পে প্রায় ৮০ শতাংশ নারী কাজ করেন। গ্রামীণ নারীদের বৃহৎ একটা অংশ বর্তমানে এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। অর্থাৎ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারীর ভূমিকা বেশ বৃহৎ পরিসরে। এসবের পরও নির্মম বাস্তব সত্য হলো, নারীরা এখনো পুরুষের খাঁচায় গৃহপালিত পাখির ন্যায় বন্দি। গার্মেন্টসে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করে আসার পরে আবার স্বামী-সন্তানদের জন্য রান্না করা, ঘর গোছানো, কাপড় ধোয়া—সমস্ত কাজই নারীকে করতে হয়। আবার যখন ঐ নারী গার্মেন্টস থেকে পারিশ্রমিক পায়, তখন ঘরের পুরুষটি জোরজবরদস্তি করে হলেও সেই অর্থ আত্মসাৎ করে! এবাবে নারীর অর্থের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ফলে বহু পুরুষের মধ্যে কর্মহীনতার প্রয়াস দেখা যায়। ফলে পাড়া-মহল্লায় অনৈতিক কাজে ধীরে ধীরে তারা প্রবেশ করতে শুরু করে। আসক্ত হয়ে পড়ে মাদকদ্রব্যে। আশ্চর্যজনকভাবে তখনো রক্ষাকর্ত্রীর দায়ভার পড়ে স্ত্রীর ওপরেই! সারা দিন পরিশ্রম করে বাসায় ফিরে স্বামীর নেশা-পানির অর্থ দিতে হয় স্ত্রীকে। কোনো কারণে ব্যাঘাত ঘটলে কপালে জোটে বেত্রাঘাত, চরণাঘাত, ঝাড়ুর আঘাত। স্ত্রীজাতি সমাজ, সংসার, সন্তানদের প্রতি অগাধ মায়া স্থাপন করার ফলে না পারে আত্মহনন করতে, না পারে দূরে কোথাও চলে যেতে। সত্যিই এ জগত্-সংসার বড্ড মায়াময়!

কর্মক্ষেত্রে নারীর অবস্থান তুলে ধরতে ২০২০ সালে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় বলা হয়, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। তবে সংসারের ভেতর ও বাইরের কাজের মূল্য ধরা হলে নারীর অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৭ লাখ নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা—অর্থনীতির বৃহত্তর এই তিন খাতে কাজ করছেন। তবু বিজয়ের ৫১ বছর পেরিয়েও এখনো নারীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করতে পারেননি। অথচ পৃথিবীর শুরু থেকেই এই নারীরাই যে কোনো সংগ্রামে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করেছেন; করছেন এখনো।

সুতরাং, বর্তমান সমাজ কাঠামোর বিরুদ্ধে জয় লাভ করতে হলে সবার আগে নারীকে হতে হবে, সুশিক্ষিত, আত্মপ্রত্যয়ী ও অধিকার সচেতন। অধিকার আদায়ে হতে হবে আপসহীন। বিজয়ের এই মাসে প্রত্যাশা রইল— বাংলার নারীসমাজ জেগে উঠুক আপন উদ্যমে; নারীর আগামীর পথচলা হোক সফলতায়। রুদ্ধদ্বার ভেঙে স্বাচ্ছন্দ্যে এগিয়ে যাক বাংলার নারী সমাজ। 

লেখক :  শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন