বিশ্বকাপ মঞ্চে লাল-সবুজের বাংলাদেশ

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:২৩

জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া কাতার বিশ্বকাপের সমাপ্তির ঘণ্টা বাজছে। প্রতি চার বছর পর বিশ্বের নানা প্রান্তে মহাসমারোহে ফুটবল মহাযজ্ঞের আসর বসে। ফুটবল বিশ্বকাপের ৯৮তম আসরে সাতটি মহাদেশ থেকে বাছাইকৃত বত্রিশটি দেশ নিয়ে মরুর দেশ কাতারে বসেছে বিশ্ব ফুটবলের সবচাইতে মর্যাদাপূর্ণ আসর কাতার বিশ্বকাপ-২০২২। বিশ্বকাপকে ঘিরে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী উন্মাদনায় মেতে ওঠে এবারও। বরাবরের মতোই বিশ্ব ফুটবলের উন্মাদনায় সারা বিশ্বকে ছাপিয়ে যায় ফুটবলপ্রেমী বাঙালির আবেগ-উচ্ছ্বাস আর প্রাণোচ্ছলতা। এবারের বিশ্বকাপ মৌসুমে দেশের গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-নগরে-বন্দরে শুরু হয় খেলাপাগল বাঙালির ফুটবল উন্মাদনা—যার রেশ এখনো বয়ে যাচ্ছে। 

চলতি কাতার বিশ্বকাপে দল হিসেবে মাঠে নেই বাংলাদেশ। তাতে কী? সরাসরি না খেললেও বিশ্বমঞ্চের এই মহারণে চলছে বাংলাদেশ বন্দনা। দল হিসেবে মাঠে না থাকলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্টেডিয়াম নির্মাণের মতো বিষয়গুলোতে যুগান্তকারী ভূমিকার কারণে কাতার সরকার কর্তৃক স্থাপিত ‘ফ্ল্যাগ প্লাজায়’ উড়ে চলছে লাল-সবুজের গৌরবোজ্জ্বল পতাকা। এ সম্মান-স্বীকৃতি বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে দান করেছে অনন্য মর্যাদা। বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে চোখধাঁধানো সব উন্নয়নের মাধ্যমে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ কাতার। উন্নয়ন মহাযজ্ঞের এই ভিড়ে অত্যাধুনিক সব স্থাপনা নির্মাণ, বিলাসবহুল হোটেল, মেট্রোরেল পরিষেবা, যোগাযোগের আমূল পরিবর্তন সাধন ও আধুনিক সুবিধাসংবলিত বিশালাকার আটটি দৃষ্টিনন্দন স্টেডিয়াম নির্মাণ করে কাতার বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আর এসব অবকাঠামোগত উন্নয়নে রয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক ও নির্মাতাদের অসামান্য অবদান। বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে মরুর দেশে আসা লাখো কোটি পর্যটক ও কর্মকতাদের পরিবহন, আবাসন, নিরাপত্তা এবং উষ্ণ আতিথেয়তা প্রদানে নিয়োজিত আছে ২০ লাখের বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী। মেইড ইন বাংলাদেশ লেখা ৬ লাখের বেশি টি-শার্ট পরিধান করছেন বিশ্বকাপে নিয়োজিত রেফারি, কর্মকর্তা, বল বয়েজ ও হাজারো দর্শকশ্রেণির প্রতিনিধি। এছাড়া বাংলাদেশের মেয়ে আয়েশা পারভীন কাতার বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত কন্টেইনারবাহী স্টেডিয়াম ৯৭৪-এ চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্বকাপের ম্যাচ পরিচালনার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রেফারিং কো-অর্ডিনেটর হিসেবে আছেন বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সন্তান শওকত আলি। আল রায়ান শহরে অবস্থিত বিশ্বকাপের অন্যতম স্টেডিয়াম ‘এডুকেশন সিটি স্টেডিয়াম’ নির্মাণে প্রকোশলী হিসেবে ওয়াশিকুর রহমান শুভর অবদান বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে গৌরবান্বিত করেছে। কাতার বিশ্বকাপে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রায় ১৫ লাখ পর্যটককে স্বাগত জানাতে কাতারের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও ভাষাগত দক্ষতায় অভিজ্ঞ বহু বাংলাদেশি নিয়োজিত রয়েছেন। অধিকন্তু, স্টেডিয়ামের সৌন্দর্যবর্ধন, ব্র্যান্ড নিউ সিটি হিসেবে লুসাইল সিটির ভিত্তি স্থাপনেও জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। অবকাঠামোগত এই মহাযজ্ঞের বিনির্মাণে বহু শ্রমিকের শ্রম-ঘাম আর আত্মত্যাগের কথাও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। 

উল্লেখ করতে হয়, প্রায় ৬ হাজারের মতো শ্রমিকের আত্মত্যাগ মরুর বুকে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যেখানে প্রায় ১ হাজার বাংলাদেশি তাদের জীবন উত্সর্গ করেছেন বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ফুটবলপাগল বাংলাদেশিদের ফুটবল উন্মাদনার খবর শুধু কাতার নয়, নজর কেড়েছে সমগ্র বিশ্বের। বিশেষত, ল্যাটিন ফুটবল জায়ান্ট ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার প্রতি বাঙালির বাঁধভাঙা সমর্থন দেশগুলোতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন মহাতারকা লিওনেল মেসির হাতে লাল-সবুজের পতাকাবাহী ছবি লাগিয়ে বাংলাদেশের প্রতি মর্যাদাদানের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়েছে। ল্যাটিন এই দেশটির ফুটবল কোচ, মিডিয়া এবং জনসাধারণ বাংলাদেশি সমর্থকদের প্রশংসার কোনো কমতি রাখছে না। নিজ দেশ কিংবা স্টেডিয়াম—সবখানেই আর্জেন্টাইন নাগরিকদের হাতে শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। অন্যদিকে, বাংলাদেশ বন্দনায় পিছিয়ে নেই ফুটবলের দেশ ব্রাজিলও। ব্রাজিলিয়ান গোলকিপার এডারসনের পরিবারকে দেখা যায় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের পতাকা হাতে ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ বলে স্লোগান দিতে। অনেক ব্রাজিল সমর্থককে বাংলাদেশের পতাকা হাতে উচ্ছ্বসিত মুহূর্তের ছবি বাংলাদেশের মানুষকে আপ্লুত করেছে। করেছে গর্বিত। ফুটবল মহারণের এই বিশ্ব আসরে মাসব্যাপী ফুটবল উৎসবে মেতে থাকে সারা বিশ্ব। মাঠ কিংবা মাঠের বাইরে চলতে থাকে বিশ্বফুটবলের চুলচেরা বিশ্লেষণ। সমর্থকরা মেলাতে থাকে নানা সমীকরণ। ফুটবল বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে সমগ্র বিশ্বের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আদানপ্রদানের প্রাণকেন্দ্র। ফুটবলপাগল বাঙালিও পিছিয়ে থাকে না কোনো অংশে। এদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে হিড়িক পড়ে যায় ফুটবল উৎসব উদযাপনের নানমুখী কর্মযজ্ঞের। ফুটবল যেন বাঙালিকে বিশ্ব সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্রে একীভূত করে তোলে। বিশ্বকাপ ফুটবলের ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শনের সুযোগ না পেলেও নানামুখী কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্তায় কাতার বিশ্বকাপ ধরণীর বুকে প্রিয় স্বদেশকে পৌঁছে দিয়েছে অন্য এক উচ্চতায়।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন