বাংলাদেশের ইতিহাস এবং দৈনিক ইত্তেফাক একসূত্রে গাঁথা

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০৩:২৪

হালকা রোদের মিষ্টি শীতের সকাল। পাখির কলকাকলিতে মুগ্ধতা ছড়ানো চারপাশ। পাল তোলা নৌকায় দূর থেকে ভেসে আসা ভাটিয়ালি গানের সুর। ততক্ষণে সবুজের বুক জুড়ে লালাভা ছড়িয়েছে পুব আকাশে; লাখো প্রাণের বিনিময়ে কেনা রক্তাক্ত বিজয়ের প্রতীক! ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, সঙ্গে হকার ভাইয়ের দিয়ে যাওয়া প্রিয় ইত্তেফাক। এই তো দিনের শুরু !

যতটা সহজে এমন সকাল দেখার সৌভাগ্য আমার হয়, ইত্তেফাকের যাত্রাকালীন সকালগুলো এতটা সহজ ছিল না। শোষণের কঠিনতম পরিস্থিতি মোকাবিলা করে, শোষকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্যকে প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ইত্তেফাক। সে বড় ভয়ানক সময়! ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরু করে ইত্তেফাক। যাত্রার নায়ক সাহসী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। এরপর ১৯৬৬ সালের ছয় দফা থেকে শুরু করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ’৭০-এর নির্বাচন—প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ইত্তেফাক পালন করে অগ্রসেনার ভূমিকা। শোষকের শোষণের মুখেও ইত্তেফাক জাতীয় চার নেতার কৃতিত্ব তুলে ধরেছে। লাখ লাখ মানুষের সামনে মওলানা ভাসানীর মুজিবের সঙ্গে সংগ্রামের ঘোষণাকে তুলে ধরেছে। বাংলার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ কণ্ঠের হুংকারকে প্রতিনিয়ত প্রধান শিরোনাম করাসহ ইত্তেফাকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতো প্রতিনিয়ত! অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইত্তেফাকের সত্য প্রকাশ প্রথম পরিপূর্ণতা পেল ১৯৭১ সালে বিজয়ের গল্প দিয়ে। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১। ইত্তেফাক প্রধান শিরোনামে লিখল, ‘দখলদার পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ, সোনার বাংলা মুক্ত’। কী আনন্দ নিয়েই না ছাপা হয়েছিল সেই সংখ্যা! ভাবতেই অবাক হই! চোখ ছলছল করে। স্বাধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে আজ অবধি সব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষে শক্তিশালী সহযোদ্ধাদের দৈনিক হিসেবে ইত্তেফাক সর্বজনবিদিত। মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের পত্রপত্রিকা নিয়ে যারা ঘাঁটাঘাঁটি করেন, তারা জেনে থাকবেন—মুক্তিযুদ্ধ এবং দৈনিক ইত্তেফাকের পারস্পরিক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। একজন যোদ্ধার হাতে থাকা অস্ত্র কিংবা হাতিয়ারের মতো। দুটি সরলরেখার পাশাপাশি ছুটে চলা।

শৈশব-কৈশোরের সময় পেরিয়ে বড় হতে শুরু করেছি ততদিনে। নতুন প্রজন্মের ছোট্ট একটি অংশ হিসেবে আমার অনুভূতিগুলো প্রকাশের জন্য হাহাকার করছিলাম। সমাজের নানান বিষয়বস্তু নিয়ে কথা বলার আকাঙ্ক্ষা আমাকে পেয়ে বসল। মানুষের কথা বলতে চাই! কিন্তু ভাবছিলাম, কাকে শোনাব আমার কথা? গত ’৬৯ বছর ধরে সত্য আর সৌন্দর্যের প্রতীক ইত্তেফাক আশ্চর্যজনকভাবে নতুন প্রজন্মকে বুঝতে পারল। ইত্তেফাকের পাতায় প্রকাশিত হতে শুরু করল ‘নতুন প্রজন্মের ভাবনা’। ইত্তেফাক যে সবার চেয়ে আলাদা, সে কথা প্রমাণিত হলো আবারও। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বলতে হয়, এর মাধ্যমে প্রজন্মের একটি বড় অংশকে সুনাগরিক হয়ে গড়ে ওঠা এবং সচেতনতাচর্চায় প্রচণ্ডভাবে ভূমিকা রাখছে ইত্তেফাক। ‘নতুন প্রজন্মের ভাবনা’কে অনবদ্য বলার বিশেষ কারণ হলো, এর মাধ্যমে জেনারেশন গ্যাপ পূরণ হচ্ছে। প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি হচ্ছে। অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা ইতিহাস জানতে পারছি। ইতিহাসের এই পর্যালোচনার মাধ্যমে আমরা পরবর্তী বাংলাদেশকে সাজানোর প্রত্যয় খুঁজে পাই। এই সমস্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে সেতু হয়ে দায়িত্ব পালন করছে ইত্তেফাক। সময় ও পরিবেশ, পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরি করা ইত্তেফাকের একটি নিদর্শন।

ইত্তেফাকের কীর্তি নিয়ে বহু কথা বলা যায়। এই লেখাটি যখন লিখছি, তখনো আমার সামনে ১৯৭১ সালে ছাপা ইত্তেফাকের বহু প্রতিবেদন রয়েছে। পাকিস্তানি সরকারের তাক করা বন্দুকের নিশ্চিত নিশানা, চারপাশে যখন মৃত লাশের গন্ধ, দানবের হুংকার, শোষকের আত্ম-অহংকারের তীব্রতা—ইত্তেফাক যে তখনকার দিনে মুক্ত গণমাধ্যমের সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল এই লেখাগুলো তার জীবন্ত প্রমাণ। পাকিস্তানিদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে পত্রিকার প্রথম পাতায় গোটা গোটা অক্ষরে স্পষ্ট করে বড় বড় শিরোনামে লিখেছিল ‘সোনার বাংলায় মানবেতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ’। ইত্তেফাক প্রেরণা জুগিয়েছে মুক্তিবাহিনীকে। বঙ্গবন্ধু যখন কারাবন্দি হলেন, ইত্তেফাক তখন আবারও দাপটের সঙ্গে প্রথম পাতায় প্রধান খবর ছাপাল—‘বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি না দিলে পাকিস্তান আক্রমণ করা হইবে’। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠার মতো শিরোনামগুলো ভাবিয়ে তোলে আমাকে, নতুন প্রজন্মকে ! ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১। রাত প্রায় ৩টার দিকে সে সময়ে ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে সশস্ত্র বাহিনী তুলে নিয়ে যায়। আর ফেরেননি তিনি। মুক্ত গণমাধ্যমচর্চার ইতিহাস বোধ হয় একেই বলে। ইত্তেফাকের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বলতেই হয়, অস্ত্র হাতে যারা যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছিল, তাদের এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে ইত্তেফাক। সত্য তথ্যকে প্রকাশ করে বিশ্বকে জানিয়েছে বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর নির্যাতনের ইতিহাস। বিশ্ব অবাক হয়েছে! পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্নভাবে। বাংলাকে শত্রুমুক্ত করার কার্যক্রম এগিয়ে গিয়েছে অনেকাংশে ।

বলতে শুনেছি, এই প্রজন্মের সবটুকুই রসাতলে চলে যাচ্ছে, অনেকেই হতাশ। আমি তা মানতে নারাজ। প্রজন্মের অধিকাংশই হারিয়ে যাচ্ছে; একদমই তা মনে করি না। আমি দেখি, এই প্রজন্মের অসংখ্য তরুণ রাজপথে উদ্দীপনা ছড়াচ্ছে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে উত্তপ্ত ভাষণ দিচ্ছে। তারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন। শুধু দেশ নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়েও ভাবছে। তারা অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করছে। সরকারকে নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করছে। কলম হাতে মতামত প্রকাশ করছে। দেশের অর্থনীতি নিয়ে এই প্রজন্ম সচেতন নয়, কে বলেছে সেসব কথা? এই প্রজন্ম ভবিষ্যতের স্বপ্নকে প্রতিনিয়ত যত্ন করে লালন করছে—ইত্তেফাকের ‘নতুন প্রজন্মের ভাবনা পাতা’ তার প্রমাণ। সত্যের আভিজাত্যকে চর্চা করা এবং টিকিয়ে রাখা এই পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। ইত্তেফাক সেই কঠিন কাজটিকেই বাঁচিয়ে রেখেছে। দৈনিক ইত্তেফাক একটি অপ্রতিরোধ্য ধারালো কলমের প্রতীক। যে কলমের কালি কখনোই শেষ হয়ে যায় না!

লেখক : শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন