ইত্তেফাক যেন ধ্রুবতারা হয়ে থাকে

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০৩:২৮

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বারবার উঠে আসে দেশের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাকের নাম। প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সত্য, ন্যায় এবং গণতন্ত্রের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে পত্রিকাটি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমি এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইত্তেফাকের নাম, যা ছিল পূর্ব-বাংলা স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের মুখপত্র। এ দেশের রাজনীতি ও সাংবাদিকতাকে একটি অনন্য সেতুবন্ধনে গড়ে তুলেছিল পত্রিকাটি। তাই ইত্তেফাকের ইতিহাস এ দেশের গণমানুষের মুক্তি, সংগ্রাম এবং অধিকার আদায়ের ইতিহাস।

১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুপ্রেরণা এবং সহযোগিতায়, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় যাত্রা শুরু হয় দৈনিক ইত্তেফাকের। এরপর থেকে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে জনগণের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে ইত্তেফাক ছিল সদা তত্পর। পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক এ দেশের মানুষের ওপর নৃশংস অত্যাচার এবং নির্যাতনের চিত্র প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরে প্রচারিত হতো পত্রিকাটিতে। ১৯৫৪-এর সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি ইশতেহার প্রচার এবং মৌলিক দাবিগুলোকে গণমুখী করে যুক্তফ্রন্টের বিজয় নিশ্চিতকরণে ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। আইয়ুব খান হতে ইয়াহিয়া খান পর্যন্ত সব সামরিক শাসনের জুলুম, নির্যাতনের প্রতিবাদে সংবাদ প্রকাশিত হয় ইত্তেফাকে। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর সম্পাদক মানিক মিয়া সামরিক শাসনের সমালোচনা করে ‘মোসাফির’ শিরোনামে লেখা শুরু করেন ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ নামক কলাম। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ ছয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করলে অধিকাংশ দৈনিক পত্রিকাই ছয় দফার বিরোধিতা করে। সে সময় দৈনিক ইত্তেফাক ছয় দফার পক্ষে অন্যতম প্রচারকের ভূমিকা পালন করে। ফলস্বরূপ পরদিনই পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়, বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয় নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস এবং গ্রেফতার করা হয় মানিক মিয়াকে। সে সময় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শর্ত মেনে তাদের সঙ্গে আপস করলে অব্যাহত রাখা যেত প্রকাশনা। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এবং দেশপ্রেমিক মানিক মিয়া সংবাদপত্রের  প্রতি দেশের মানুষের আস্থা ভঙ্গ হতে দেননি। তিন বছর পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ রেখেছেন তবুও দেশবিরোধী শক্তির সামনে মাথা নত করেননি। ১৯৬৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশের অনুমতি পাওয়ার পরপরই বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে প্রকাশ্য সমর্থন দেয়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পুরোটা সময় ধরে ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল অসামান্য। পহেলা মার্চের সামরিক আইনের বিধানকে তোয়াক্কা না করেই সে সময়কার অসহযোগ আন্দোলনের খবর নিয়মিত প্রকাশ করত ইত্তেফাকে। শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও সামান্য পরিমাণ বিচ্যুতি ঘটেনি সংবাদপত্রের নীতি, আদর্শ থেকে। দেশের কল্যাণে সত্য প্রকাশ এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে কখনো কালক্ষেপণ করেনি পত্রিকাটি। একাধিকবার গ্রেফতার করা হয়েছে সম্পাদককে, সংবাদকর্মীরা পার করেছেন দুঃখ, দুর্দশাগ্রস্ত দিন তবুও স্বাধীনতার প্রশ্নে, গণতন্ত্রের প্রশ্নে, গণমানুষের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন থেকে গেছে দৈনিক ইত্তেফাক। অস্তিত্ব সংকটের ঝুঁকি নিয়েও প্রকাশ করে গেছে বস্তুনিষ্ঠ সত্য সংবাদ—যা ছিল অত্র উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

বহু চড়াই-উতরাই পার হয়ে ঐতিহ্য, সংগ্রাম এবং সাফল্যের ৭০ বছরে দৈনিক ইত্তেফাক। প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী এতগুলো বছর ধরে দেশ, জাতি গঠনে সংবাদপত্রের দায়িত্ব নিরলসভাবে পালন করে যাচ্ছে পত্রিকাটি। মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার চেতনায় লালিত যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি, তা বাস্তবায়নের পথে অগ্রগামী ভূমিকা ছিল ইত্তেফাকের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং দৈনিক ইত্তেফাকের সম্মিলিত প্রয়াসেই এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের প্রতিটি অলিতে গলিতে, কেঁপে উঠেছিল শত্রুর মসনদ। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ২৫ শে মার্চ কালরাতে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল ইত্তেফাককে, কিন্তু গণমানুষের ভালোবাসা, অকুণ্ঠ সমর্থন এবং আস্থার জোরে বারবার প্রবল প্রতাপে ফিরে এসেছে দৈনিক ইত্তেফাক। জনগণের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরতে ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এর আগে এই ভূখণ্ডে পত্রিকার ভাষা ছিল গুরুগম্ভীর। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াই প্রথম দৈনিক ইত্তেফাকের মাধ্যমে পত্রিকাকে করে তোলেন সার্বজনীন সুখপাঠ্য। এমনকি সংবাদপত্রে প্রতিদিন উপসম্পাদকীয় রাখার প্রথা চালুর দাবিদারও দৈনিক ইত্তেফাক, যেখানে দেশের সচেতন নাগরিকগণ দেশের সুবিধা-অসুবিধা, সমস্যা, সংকট নিরসনে তাদের মূল্যবান পরামর্শ সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন। ইত্তেফাক তৈরি করেছে অনেক প্রথিতযশা সাংবাদিক, লেখক এবং কলামিস্ট। এই ধারা অব্যাহত আছে আজও। বিশেষ করে তরুণ মেধাবী প্রজন্মের মধ্যে লেখকসত্তা জাগিয়ে তোলা এবং তাদের স্বদেশ ভাবনায় দীক্ষিত করতে কাজ করে যাচ্ছে দৈনিক ইত্তেফাক। আজ দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অশেষ কৃতজ্ঞতা এবং গভীর শ্রদ্ধা জানাই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার প্রতি; যাদের প্রেরণা এবং পরিশ্রমে এ দেশের মানুষ সংকটকালীন পাশে পেয়েছিল একটি জনবান্ধব সংবাদপত্রকে। জন্মদিনের এই শুভক্ষণে ইত্তেফাকের জন্য রইল অনেক শুভকামনা। আমরা আশা রাখি, দেশ এবং জাতির মুখপত্র হয়ে আগামীতে এভাবেই ইত্তেফাক সত্য সংবাদ পৌঁছে দেবে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। ইত্তেফাক এভাবেই বিরাজিত থাকবে আমাদের ধ্রুবতারা হয়ে।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন