ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ঘেরা ব্যস্তনগরী ঢাকায় একদিকে যেমন মানুষ প্রতিনিয়ত জীবিকার তাগিদে ছুটে আসছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানজট, তীব্র শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণের তাণ্ডব। দূষণের কবলে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে জনজীবন। যানজটের কারণে নষ্ট হচ্ছে লাখ লাখ কর্মঘণ্টা। ভোগান্তিতে পড়ছে মানুষ, সাধিত হচ্ছে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি। এতো সব সমস্যাকে জাদুর কাঠির মতো নির্মূল করতে আবির্ভাব ঘটেছে মেট্রোরেলের।
মেট্রোরেল বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের একটি অন্যতম সাফল্য। রূপকল্প-৪১-এর দিকে এগিয়ে যাওয়ার আরেকটি ধাপ। চলমান নানা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে মেট্রোরেল নির্মাণের দিকে নজর দেয়। এরপর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সমগ্র ঢাকা জুড়ে ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের কাজে হাত দেওয়া হয়। প্রকল্পের কাজ শত ভাগ শেষ করতে সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। এরই একটি অংশ এমআরটি-৬ উত্তরা থেকে আগারগাঁও (সকাল আটটা থেকে বেলা বারোটা পর্যন্ত) জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হলো গতকাল। আজ থেকে জনসাধারণ মেট্রোরেলে যাতায়াতের সুবিধা পাবে। এতে পৌনে বারো কিলোমিটার রাস্তা মাত্র দশ মিনিট দশ সেকেন্ডে পাড়ি দেওয়া যাবে। এটি নিঃসন্দেহে উন্নয়নের আরেক মাইক ফলক। নতুন এক বিস্ময়!
আগামীর দিনে মেট্রোরেল হয়ে উঠবে দেশের সর্বাধুনিক যানবাহন—এই কথা মানতেই হবে। যেখানে যাত্রীসমাজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে অতিষ্ঠ হয়ে আটকে থাকত, সেখানে দ্রুতগামী, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, সময় সাশ্রয়ী, বিদ্যুৎ চালিত, শব্দহীন, গন্ধহীন, পরিবেশ দূষণমুক্ত এমন একটি যানবাহন সত্যিই অভাবনীয় ছিল কয়েক দশক আগেও! তাছাড়া মেট্রোরেল বিশেষভাবে নারীবান্ধব যানবাহন। এখানে নারী যাত্রীদের জন্য থাকছে আলাদা আসন ব্যবস্থা, পুলিশি সেবা ও সিসি ক্যামেরার পর্যবেক্ষণ। যার ফলে সাধারণ গণপরিবহনে যেখানে নারীরা সহজে ইভটিজিংয়ের শিকার হতো সেখানে তারা নির্বিঘ্নে, স্বস্তিতে যাতায়াত করতে পারবে। এছাড়া মেট্রোরেল বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের জন্যও দিচ্ছে বিশেষ সুবিধা। এর স্বয়ংক্রিয় দরজা দিয়ে তারা সহজেই উঠানামা করতে পারবে এবং বসার জন্য পাবে সঠিক নিরাপত্তা।
এতসব সুবিধার পাশে কিছুটা দুশ্চিন্তাও রয়ে যায়। মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোতে যানবাহনের চাপ বাড়তে পারে, যা যানজট কমানোর থেকে উলটো বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া সঠিক সময়ে স্টেশনে পৌঁছতে না পারলে ট্রেন মিসের সম্ভাবনাও রয়ে যায়। সেই সঙ্গে মেট্রোরেল কি সর্বসাধারণের জন্য হচ্ছে নাকি শুধুই উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্য হচ্ছে? এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মনে। কেননা, বাসে যেখানে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা সেখানে মেট্রোরেলে এর দ্বিগুণ, ২০ টাকা। সেই সঙ্গে রয়েছে নানা আনুষ্ঠানিকতাও। এছাড়া এখানে নেই শিক্ষার্থীদের জন্য হাফপাসের ব্যবস্থা। তাই শিক্ষার্থীদের এর সেবা নিতে আর্থিকভাবে দ্বিগুণ বেগ পেতে হবে। এসব সমস্যা পেরিয়ে মেট্রোরেল যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে যাত্রা শুরু করল, তা সফল হোক। এটি হয়ে উঠুক সবার জন্য সহজলভ্য—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
