প্যানিক অ্যাটাক প্রতিরোধে চাই সচেতনতা

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:২৫

ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘A sound mind lies in a sound body’। এর অর্থ হলো, একটি সুস্থ মন নির্ভর করে একটি সুস্থ দেহের ওপর। দেহ ও মন একে অপরের পরিপূরক। একজন ব্যক্তি মানসিকভাবে সুস্থ না থাকলে যেমন তার শরীর ভালো থাকে না, তেমনিভাবে শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকলে ভেঙে পড়ে মানসিক ভাবেও। তাছাড়া একজন ব্যক্তির যদি দেহ ও মন উভয়ই ভালো না থাকে, তাহলে তিনি বেঁচে থেকেও মৃতপ্রায়! তাই স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য আমাদের শারীরিক ও মানসিক উভয় স্বাস্থ্যের দিকেই গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হচ্ছে প্যানিক অ্যাটাক, যা ইতিমধ্যে বেশ বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে।

আমরা সাধারণত চারপাশে যা দেখে থাকি, তার ওপর ভিত্তি করেই মস্তিষ্ক কাজ করে। অর্থাৎ আমাদের আশপাশের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো অনেকাংশে আমাদের মানসিক সুস্থতার নির্ধারক হিসেবে কাজ করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ আমরা শিশুদের প্রসঙ্গ টানতে পারি। শিশুরা হচ্ছে অনুকরণপ্রিয়। তাদের সুস্থ দেহ ও সুন্দর মনের বিকাশ ঘটে ছোটবেলা থেকেই। এখন একটি শিশু যদি শৈশব থেকেই দেখে যে, তার বাবা-মা ঝগড়া-বিবাদ করছে, তাহলে তখন থেকেই পরিবারের প্রতি ঐ শিশুর আলাদা একটি অনীহা তৈরি হবে, ভীতি কাজ করবে। বর্তমান সময়ে বেশির ভাগ শিশুর ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তারা কেমন যেন অস্বাভাবিক আচরণ করে থাকে! একজন সাধারণ প্রাণবন্ত শিশুর মতো তারা দৌড়াতে পারে না, হাসতে পারে না, কথা বলতে পারে না! সবকিছুতে তাদের কেমন যেন একধরনের ভয় কাজ করে। এই যে বিভিন্ন ব্যাপারে ভীতি কাজ করা, অস্বাভাবিকতা কাজ করা, বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘প্যানিক অ্যাটাক’। সত্যিকার অর্থে, প্যানিক অ্যাটাকের কারণে শিশুর মধ্যে যে ডিসঅর্ডারটি লক্ষ করা যায়, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ডিসঅর্ডারটির নির্দিষ্ট কোনো বয়স বা সময় নেই। জীবনের যে কোনো সময়েই প্যানিক অ্যাটাক হয়ে থাকে। বিশেষ করে, শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক। 

গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু ও বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। তবে আজকাল বড়রাও এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হচ্ছে। বড়দের ক্ষেত্রে এর প্রধান কারণ হচ্ছে ‘উদ্বিগ্নতা’। বিভিন্ন বিষয়ে মাত্রাতিরিক্ত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকার দরুন তারা প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়। আজকাল ক্রমবর্ধমান হারে যে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে, তার কারণ হিসেবে প্যানিক অ্যাটাকের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণায় উঠে এসেছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতি ১০ জনে এক জন প্যানিক ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত। কী সাংঘাতিক বিষয়! সময়মতো চিকিৎসাসেবা গ্রহণ না করলে প্যানিক ডিসওর্ডার ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ১৯৮০ সালে ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়েলের গবেষণা থেকে জানা যায়, সাধারণ মানুষের মধ্যে পুরুষের এই ব্যাধিতে আক্রান্তের হার যেখানে ২ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে নারীদের আক্রান্তের হার ৭ দশমিক ১ শতাংশ। উদ্বেগের বিষয়, দিনদিন নারীদের আক্রান্তের এই হার বেড়ে পুরুষের তুলনায় সাত গুণ হয়েছে। নারীদের এভাবে ব্যাপক হারে আক্রান্তের বিষয়টি ভাবলেই অবাক হতে হয়! বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্তের হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ সারা পৃথিবীর ২৬৪ মিলিয়ন মানুষ প্রতি বছর প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হয়! 

প্যানিক অ্যাটাককে রুখতে হলে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে হবে। প্রাত্যহিক জীবনের সমস্যা মোকাবিলার ক্ষেত্রে তাদেরকে অভয় দিতে হবে। বিভিন্ন সমাজমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে তো আরো ভালো কথা। আর প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অপ্রিয় সত্য হলো, আমরা অবান্তর চিন্তাভাবনা বেশি করি। এতে করে সব সময় উদ্বিগ্ন ও চাপের বোঝা মাথায় চেপে থাকে। তাই নেতিবাচক চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে সহজ-সরল জীবনযাপনে আগ্রহী হওয়ার বিকল্প নেই। সর্বোপরি, সচেতনতার মাধ্যমেই প্যানিক অ্যাটাক প্রতিরোধ করা সম্ভব। সত্যিকার অর্থে, শুধু প্যানিক ডিসঅর্ডার রোধেই নয়, সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপনের অন্যতম পূর্বশর্তই হলো ইতিবাচক চিন্তাভাবনা। 

লেখক : শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন