সড়ক দুর্ঘটনা কেন বেড়েই চলেছে? 

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০২

মৃত্যু অনিবার্য। প্রতিটি প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তবে সেই মৃত্যু যদি স্বাভাবিকভাবে হয় তাহলে মেনে নেওয়া যায়; কিন্তু কিছু কিছু অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে যখন আমাদের কাছের মানুষের জীবন ঝরে যায় তখন তা মেনে নেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে। তেমনই একধরনের মৃত্যু হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া। একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের জন্য কান্না। অকালে পরিবারের একজন সদস্যের মৃত্যু যেন কেউ কখনো মেনে নিতে পারেন না।

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু শুধু একটি পরিবারে গভীর শোক, ক্ষত সৃষ্টি করে না, আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে ফেলে ঐ পরিবারকে। কোনো কোনো দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি প্রাণ হারান। তখন ঐ পরিবারের যে কী অবস্থা হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যারা পঙ্গুত্ববরণ করেন তাদের পরিবারের অবস্থা আরো করুণ, আরো শোচনীয়। আর কোনো আর্থিক সম্পদ কখনোই কোনো সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত পরিবারের সুখ ফিরিয়ে আনতে পারে না।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২৩৭ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। বিদায়ি ২০২২ সালের দিকেও শতাধিক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার বড় একটা অংশ পথচারী। রাতে ও ভোর রাতে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে। শীতের মাসে কুয়াশা থাকায় এই ঘটনা যেন আরো বেশি ঘটে চেলেছে। বেশির ভাগ দুর্ঘটনা হয়েছে গাড়িচাপায় বা গাড়ির ধাক্কায়। 

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ঘরের। তারা নিজেদের পরিবারের সদস্যদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য ঘরের বাহিরে কাজের সন্ধানে বের হয়। এতে রাস্তাঘাটে চলার পথে অদক্ষ চালাকদের অসাবধানতার কারণে তারা বিভিন্ন ধরনের সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে কিছু ব্যক্তি পঙ্গুত্ব বরণ করে এবং অনেক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে। ফলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। এসব সড়ক দুর্ঘটনায় যেসব জীবন ঝরে যায়, তাদের জীবনের আসলে মূল্য কত? অথবা সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে যারা বেঁচে থাকেন, তাদের এই ভোগান্তির আর্থিক মূল্যই-বা কত?
দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তি এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের আর্থসামাজিক যে ক্ষতি হচ্ছে, তার হিসাব তৈরি করেছে বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই)। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব বলছে—২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। আর রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মানবসম্পদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি।
সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে গত এক যুগে জাতীয় বাজেটে ধারাবাহিকভাবে বরাদ্দ বেড়েছে। এ সময়ে নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো সড়কও চওড়া হয়েছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সড়ক আইন পাশ করেছে সরকার; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সড়কে কোনোভাবেই মৃত্যু কমছে না। গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পিছনে মোটা দাগে কয়েকটি কারণ পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে, চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অতিরিক্ত গতি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক।

তবে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও মৃত্যু নিয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে এমন এক তথ্য বলেছে যে, সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুতা বেড়ে যাওয়া, যত্রতত্র রাস্তা পারাপার, মোবাইল ফোনে চোখ রেখে চলাচল এবং যানবাহনে সংখ্যা বেড়ে যাওয়া অন্যতম কারণ। এর বাইরে রয়েছে চালকের বেতন, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকায় মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জনসাধারণের ওভারব্রিজ, ফুটপাত না মানা এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে, একটা সুশৃঙ্খল নিয়মনীতি তৈরি করতে হবে যাতে করে সাধারণ মানুষ সেই আইন মানতে বাধ্য হয়। মনে রাখতে হবে একটা দেশের উন্নয়ন সেই দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ব্যবসা বাণিজ্যের আমদানি-রপ্তানি সেই দেশের যোগাযোগব্যবস্থার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। তাই যথাযথ আইনের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা যেন কমানো যায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

সড়কে মৃত্যুর মিছিল কমাতে হলে শুধু সরকারের একার পক্ষে দায়িত্ব নিলে হবে না। সাধারণ মানুষকেও নিজ দায়িত্বে সচেতন হতে হবে, রাস্তা পারাপারের সময় উভয় দিকে খেয়াল রাখতে হবে, অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ও যাত্রীবোঝাই যানবাহন পরিহার করতে হবে। সবাই সম্মিলিত প্রচেষ্টা থেকে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টদের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা, সড়কে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে শুধু আইন কার্যকর নয়, কঠোর নজরদারিসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। তাই আমাদের নতুন বছরে সবার অঙ্গীকার হোক এটাই যে, সরকারের বিধিবদ্ধ আইনশৃঙ্খলা মেনে চলব এবং অন্যদের আইন মেনে নিতে উত্সাহ প্রদান করব। আসুন আমরা নিজ দায়িত্বে সচেতন হয়ে নিজে সুস্থ থাকি, অন্যকে সুস্থ রাখি।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন