তেইশে সংকট আছে, সম্ভাবনাও আছে 

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:১০

সমস্যা আর সম্ভাবনায় বিজয়ের ৫১ বছর অতিক্রম করে ৫২তে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সূচনালগ্ন থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক অবস্থা—সবকিছুতেই নানা নাটকীয়তা দেখেছে বাংলাদেশ। নানা অচলায়তন ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। গড়া হয়েছে অনেক ইতিহাস। ৫১ বছরে আমাদের হয়তো আরো অনেক দূর যাওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু হয়নি। তা এখন বাস্তবতা। বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে, উন্মোচিত হচ্ছে উন্নয়নের দ্বার। এই এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ২১ শতকের দ্বিতীয় দশকের প্রারম্ভেই বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করল মহামারি করোনা ভাইরাস। পুরো বিশ্বের প্রতিটি জনপদে এই ভয়াবহতার হাওয়া প্রবাহিত হয়েছে। এই প্রবহমান হাওয়ার ভয়াবহতা থেকে বিশ্ববাসী ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ইউক্রেনের ওপর হামলা করে বসে রাশিয়া। এ থেকেই শুরু বিশ্বে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। এই অধ্যায়ে বাংলাদেশের ইতিহাস কেমন হবে তা সময়ই বলে দেবে। 

সংকটে সঠিক দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব থাকলে সংকট মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে পারে দেশ ও জাতি। করোনা ভাইরাসের সময় আমরা অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। প্রথম দিকে অপ্রস্তুত বাংলাদেশের জন্য করোনা মোকাবিলা সহজ ছিল না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা এবং নিবেদিতপ্রাণ ডাক্তার, পুলিশ, প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীদের প্রচেষ্টায় আমরা এ যাত্রায় বেঁচে যাই। গতিশীল হতে শুরু করে অর্থনৈতিক অবস্থা। 

স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আগেই রাশিয়া তার প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনের ওপর হামলা করে বসে। ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয়ই সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশ ছিল। ভূরাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইউক্রেনের ওপর হামলা করে রাশিয়া। বিশ্বের যে কোনো দেশে যুদ্ধ লাগলে তাদের আশপাশের দেশ এবং তাদের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশগুলোও প্রভাবিত হয়। রাশিয়ার তেল-গ্যাস সরবরাহের ওপর অনেক দেশ নির্ভরশীল। এছাড়া গম, ভুট্টা উৎপাদনের ক্ষেত্রেও দেশ দুটি ভালো অবস্থানে আছে। যুদ্ধের কারণে আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে।

আইএমএফসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে বারবার বলা হচ্ছে, ২০২৩ সালে বিশ্ববাসী এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাবে। বৈশ্বিক সমস্যার সঙ্গে বাংলাদেশে ডলারের সংকট, ব্যাংকিং খাতের নানা নাটকীয়তা এবং জাতীয় নির্বাচন যোগ হয়েছে। ডলারের মূল উৎস হলো বৈদেশিক রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স থেকে প্রাপ্ত অর্থ। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে দেশের বাইরে অর্থ পাচার করা হয়েছে। এছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স সঠিক পথে না আসায় আমাদের যে পরিমাণ ডলার আসার কথা, তা আসছে না। ডলারের সংকট মোকাবিলার জন্য প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স সঠিক পথে আনার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 

জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে আমরা ভবিষ্যতে অনেক সমস্যা মোকাবিলা করতে পারব। দেশের বাইরে শ্রমশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে তাদের প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আর বর্তমানে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের ট্রেনিং ও ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এর ফলে প্রবাসীরা যেমন সুফল পাবে, একই সঙ্গে তারা রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে কার্যকর মাধ্যম ব্যবহার করবে । 

ব্যাংকিং খাত যে কোনো দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। গত কয়েক দিনে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী দেশের ব্যাংকিং খাত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা এবং সঠিকভাবে মনিটরিং করার মাধ্যমে টাকা সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তেইশের সংকটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সচল রাখতে সহজ শর্তে অর্থের জোগান দিতে হবে। এর ফলে অর্থনীতি গতিশীল থাকবে। বাংলাদেশে নির্বাচনের আগের বছর সব সময় উত্তাপ থাকে, তা এ দেশের রাজনৈতিক কালচার। এর প্রভাব কিছুটা হলেও অর্থনীতির ওপর থাকে। 

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের পোশাক খাতসহ অন্যান্য উত্পাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল থাকবে। এর জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে এবং বিদ্যুতের বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। সৌর প্যানেল ব্যবহার করা যেতে পারে। 
২০২৩-এর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে পারলে বাংলাদেশ তার নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারবে। এই নতুন অধ্যায় শুরু করার আগে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোর সম্মিলিত সফলতার প্রয়োজন আছে। সংকট মোকাবিলা করে সম্মিলিত প্রয়াসে সম্ভাবনার পথে অন্যন্য সমৃদ্ধশালী একটি দেশ হয়ে উঠুক বাংলাদেশ— এটাই আমাদের প্রত্যাশা। 

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন