বায়ুদূষণ কতটা মারাত্মক তা আমাদের অজানা নয়। কারণ আমরা বায়ুদূষণের সঙ্গে যুদ্ধ করেই বেঁচে থাকি! বাংলাদেশ বায়ুদূষণের তালিকায় শীর্ষস্থানে থাকে অধিকাংশ সময়ই। আর শহর হিসেবে ঢাকার অবস্থাও একই। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে সবার প্রথমে ঢাকার অবস্থান। এই দূষণযন্ত্রণা থেকে উত্তরণের উপায় আমরা কোনোভাবেই পাচ্ছি না। প্রতিবারই এই এক বিষয় নিয়ে আলোচনা, গোলটেবিল বৈঠক, টকশোর বন্যা বয়ে যায়। আলোচনার ঝড় ওঠে। কিন্তু দিন শেষে অবস্থা ‘যেই লাউ সেই কদু’।
একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪০ হাজার শিশুর মৃত্যুর জন্য সরাসরি বায়ুদূষণ দায়ী। বায়ুদূষণের কারণে যে শুধু আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি তা কিন্তু নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বায়ুদূষণে ওজনস্তর পাতলা হয়ে যাচ্ছে, যার করণে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণের কারণে স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক, ফুসফুসে ক্যানসার এবং ফুসফুসের রোগে বছরে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। বায়ুদূষণের কারণে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে অন্তত ১ দশমিক ২৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি-২০১৯’ প্রতিবেদনে ১৯৯০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বায়ুর গুণমানবিষয়ক তথ্য নিয়ে এই গবেষণা করা হয়।
বায়ুদূষণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট (এইচইআই) এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের (আইএইচএমই) যৌথ উদ্যোগে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণযুক্ত পরিবেশে কোনো শিশু বেড়ে উঠলে তার গড় আয়ু ৩০ মাস (২ দশমিক ৫ বছর) পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত এলাকা রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। মৃত্যুঝুঁকির অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণ অধিকতর দায়ী। বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২ দশমিক ৫ (২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে ছোট ব্যাসের বস্তুকণা)। এশিয়ায় বায়ুর গুণমান অনেক খারাপ। বিশেষ করে বাংলাদেশের জনগণ ১৯৯০ সাল থেকে পিএম ২ দশমিক ৫ মাত্রার মধ্যে বসবাস করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণের কারণে মানুষের তৎক্ষণাৎ বা দ্রুত মৃত্যু হয় না। বরং এটা একধরনের নীরব ঘাতক। মানুষের মৃত্যুর ১০টি কারণের মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে এই বায়ুদূষণ। গত ৩০ বছরে পানি ও পয়োনিষ্কাশনজনিত মৃত্যুহার কমলেও বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুহার বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বায়ুদূষণের কারণে দেশের অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে, বিশেষ করে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে।
এই যখন অবস্থা, তখন বায়ুদূষণ থেকে দেশকে এবং দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে অবশ্যই বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। ঢাকাকেন্দ্রিক ভাবনা বাদ দিয়ে চট্টগ্রামসহ দেশের সব জেলার পরিবেশ নিয়ে ভাবতে হবে। ঢাকার পর বায়ুদূষণ চরম আকার ধারণ করেছে চট্টগ্রামে। তাই এটাকে সহজ বিষয় হিসেবে না নিয়ে এই দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। এছাড়া পরিবেশবাদি সব সংগঠনের প্রতি অনুরোধ—লোক দেখানো কাজ বাদ দিয়ে আপনার এলাকার পরিবেশ সার্বক্ষণিক সুন্দর ও সচ্ছ রাখার বিষয়ে জোর দিন আগে। নিজে সচেতন হোন, মানুষকে বায়ুদূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করুন।
লেখক : শিক্ষার্থী, ওমর গনি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, চট্টগ্রাম
