পক্ষপাতিত্বই না কাল হয়ে দাঁড়ায়! 

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৩, ০৪:৫৭

‘মামা-খালু-চাচা’ যার শক্তপোক্ত, অর্ধেক দুনিয়া তো তারই! এই মামা-খালু-চাচার একটা ফোনকল কিংবা একবার ‘আমার অমুক মামা, খালু বা চাচা আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন’ বললেই কেল্লা ফতে। যেন সাত খুন মাফ! নিশ্চিত হয়ে যাবে—আপনাকে আর কিছু করতে হচ্ছে না, আপনার কাজ এমনিতেই হয়ে গেছে! সে আপনি লাইনে ৩০০ জনের পেছনেই থাকুন কিংবা কোনো ডি গ্রেডের সার্টিফিকেটধারীই হন, আপনাকে আর কে ঠেকায়! উচ্চ ফলসমৃদ্ধ সার্টিফিকেট, স্কিল, এক্সট্রা ক্যারিকুলাম, যোগ্যতার সব পরীক্ষা দিয়ে আসা ব্যক্তিও আপনার কাছে খুবই নগণ্য, ক্ষুদ্র হিসেবে প্রতীয়মান হবে! অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, আজকের সমাজে প্রায় সব ক্ষেত্রে বাস্তব দৃশ্যপট এটাই।

আজকের দিনে মামা-খালু-চাচা না থাকার কারণে যে কতটা পেছনে পড়ে যেতে হয়, তা অজানা নয় কারো। সরকারি-বেসরকারি কর্মস্থান, অফিস-আদালত, বড় বড় মন্ত্রী-মিনিস্টার থেকে শুরু করে সব জায়গায় এদের দাপট, প্রভাব, প্রতাপ। অথচ সারা জীবন পরিশ্রম করে খুব সাধারণ পরিবারের যেসব বাবা-মা রক্ত ঘাম করা অর্থ দিয়ে সন্তানকে পড়াশোনা করাচ্ছেন, দিন শেষে তাদের স্বপ্ন থেকে যাচ্ছে অধরাই। পড়াশোনা শেষে একটা ভালো চাকরি করে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কষ্ট লাঘব করবে, ছোট ভাইবোনদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেবে, পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে বলে যে বাবা-মা অতিকষ্টে সন্তানের পড়ালেখা শেষ করাচ্ছেন, একটা সময়ে গিয়ে সেই সন্তান হেরে যাচ্ছে মামা-খালু-চাচার কাছে। কী অদ্ভুত বিষয়!

এ দেশে শিক্ষিত, যোগ্য বেকারের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। যোগ্য পদে যোগ্য ব্যক্তির বসা খুব বেশি প্রয়োজন, সেটা যে কোনো ক্ষেত্রেই হোক। যোগ্য ব্যক্তি সর্বক্ষেত্রে, সর্বস্তরে সাদরে গ্রহণযোগ্য। অথচ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা দেখছি ভিন্ন চিত্র। তা না হলে ঠিক করে হিসাবই করতে জানেন না এমন ব্যক্তি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার, ম্যানেজার হিসেবে কিংবা ঠিক করে বাংলা বানান লিখতে জানেন না এমন ব্যক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকতা পেশায় আসেন কী করে? যার অফিসে সামান্য কেরানি হওয়ারও যোগ্যতা নেই, তাকে সেই অফিসের উচ্চপদস্থ কোনো চেয়ারে দেখতে পাওয়া যায় কী করে?

সামান্য কিছু টাকা কিংবা মামা-খালু-চাচার প্রভাবের কাছে পরাজিত হয় কতশত যোগ্য, শিক্ষিত ও দক্ষ ব্যক্তি। অথচ অদক্ষ ও অযোগ্য ব্যক্তিতে সয়লাব সর্বক্ষেত্র। অব্যবস্থাপনা, অনৈতিক-অসংগতিপূর্ণ কার্যক্রম শিকড় গেড়ে বসেছে সব জায়গায়। মেধা ও যোগ্যতা হেরে যায়, যাচ্ছে পদে পদে। এর ফলে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির অভাবে বাড়ছে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনাসহ নানা বিড়ম্বনা।

আমাদের সমাজের খুব প্রচলিত একটি প্রবাদবাক্য ‘গাধা দিয়ে হালচাষ’। বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি অনেকটা সে রকমই। অযোগ্য, অজ্ঞ ব্যক্তিতে ছেয়ে গেছে সর্বত্র। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর চেয়ে সেবাগ্রহীতার জ্ঞান অনেক বেশি। আর এর বড় কারণ হলো শুধু ফেয়ার পলিসি চর্চার অভাব। এর ফলে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো যে কতটা নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে, তা ভাবলেই শিহরিত হতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে ‘ব্যবস্থা’ ভেঙে পড়তে দমকা হাওয়ারও প্রয়োজন হবে না। ঘুষ-দুর্নীতি কিংবা মামা-খালু-চাচার প্রভাবমুক্ত হতে না পারলে, প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারলে, পক্ষপাতিত্বের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে, দিনে দিনে তা পরিস্থিতিকে জটিলতর করে তুলবে। অযোগ্যদের দৌরাত্ম্যে অচলাবস্থা শুরু হবে সব সেক্টরে। সুতরাং, মাপকাঠি হতে হবে যোগ্যতা-দক্ষতা। ফেয়ার পলিসির চর্চা বাড়াতে হবে। তা না হলে ভুক্তভোগী হব আমরা। ভুক্তভোগী হবে দেশ।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন