সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২২ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শিকারী ও দর্শনার্থীদের উৎপাতে কমেছে পরিযায়ী পাখি

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ২৩:১৪

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বিগত কয়েক বছরের তুলনায় পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমেছে। শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি জলাশয়ে পাখি আসলেও এখন শুধুমাত্র একটি জলাশয়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারের অভ্যন্তরের জলাশয়টি সাধারণের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত বলে সেখানে পাখি আছে। ক্যাম্পাসে দর্শনার্থীর চাপ বাড়ায় ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের উৎপাতে পাখি কমেছে বলে জানিয়েছেন পাখি বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে উৎপাত ও অব্যবস্থাপনায় বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থান নিয়েও স্বস্তিতে নেই পরিযায়ী পাখিরা। সেসব এলাকায় শিকারীদের বিরুদ্ধে গুলতি ব্যবহার করে এবং জাল দিয়ে ফাঁদ তৈরি করে পরিযায়ী পাখি শিকারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা খুঁজতে গিয়ে পাখি বিশেষজ্ঞ ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রীদের থেকে পাওয়া ভিডিও ও ছবিতে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।

ছবি- অরিত্র সাত্তার

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উৎপাতে পরিযায়ী পাখিরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে পার্শ্ববর্তী একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গেরুয়া ও সাভারের কয়েকটি জলাশয়ে অবস্থান নেয়। তবে এসব জায়গায় পরিযায়ী পাখি রক্ষায় কোনধরণের সচেতনতা ও নজরদারি না থাকার সুযোগে এসব পাখি শিকার করছেন শিকারীরা। জলাশয়গুলোর অবস্থা আগেরদিন বিকালে একরকম থাকলেও শিকারীদের উৎপাতে পরেরদিন সকালে অন্যরকম হয়। পাখি বিশেষজ্ঞ ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রীদের মতে, ‘সকালে জলাশয়গুলোর চিত্র দেখলে মনে হয়, এখানে রাতে গোপনে পরিযায়ী পাখি ধরার মহোৎসব চলেছে।’

বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী অরিত্র সাত্তার ইত্তেফাককে বলেন, ডিসেম্বর মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আসে। আমি পাখিগুলোর দিকে খেয়ালও রাখতাম। তবে কিছুদিন পর তারা একটা ভীতিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়েছিল। তখন আর বুঝতে বাকি রইলো না যে রাতে কেউ পাখি ধরার চেষ্টা করেছে। যেহেতু ক্যাম্পাসে রাতে অনেকে মাছ ধরে, সেহেতু পাখি ধরার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রেক্ষিতে পাখিরা বিরক্ত হয়ে চলে গিয়েছিল।

ছবি- অরিত্র সাত্তার

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়গুলো সঠিক সময়ে পরিষ্কার না করায় অনেকক্ষেত্রে পাখিদের ডিম নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। পাখি চলে যাওয়ার কিছুদিন পরে ক্যাম্পাসে আবার ফিরে আসে। তবে দর্শনার্থীদের মধ্যে কেউ ছবি তোলার জন্য উড়িয়ে দিচ্ছে। আবার অনেকে পাখিদের কাছে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। যেগুলো পাখিদের বিরক্তির অন্যতম কারণ। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সবসময় বিভিন্ন অনুষ্ঠান চলে, তবে পাখিদের সমস্যা হয়। কিন্তু এবার কয়েকটি অনুষ্ঠানে মাত্রাতিরিক্ত উচ্চ শব্দ করা হয়। এতে পাখিরা বিরক্ত হয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থান নেয়।

তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থান নিয়েও স্বস্তিতে থাকতে পারেনি পরিযায়ী পাখিরা। তাদেরকে নানাভাবে বিরক্ত করা হতো। আমি নিজ উদ্যোগে কয়েকজনকে সচেতন করার চেষ্টা করেছি। এছাড়া ওই এলাকায় গুলতি ব্যবহার করে এবং জাল দিয়ে ফাঁদ তৈরি করে পরিযায়ী পাখি শিকারের মতো ঘটনা ঘটে।

ছবি- অরিত্র সাত্তার

এদিকে আগেভাগেই ক্যাম্পাস থেকে পরিযায়ী পাখি চলে যাওয়ার বিষয়ে পাখি বিশেষজ্ঞরা জলাশয়ের পাশে দোকানপাটে ভিড়, গাড়ির হর্ন, দর্শনার্থীদের কোলাহলকে দায়ী করেছেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আতশবাজি ও পটকা ফুটানো এবং সময়মতো জলাশয় পরিষ্কার না করা ও সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের গাফিলতিকেও দায়ী করেছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শীতের শুরুতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট-বড় প্রায় ডজনখানেক জলাশয়ের মধ্যে পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনের জলাশয়, পরিবহন চত্বরের পেছনের জলাশয়, সুইমিংপুল সংলগ্ন জয়পাড়া জলাশয় ও ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারের অভ্যন্তরের জলাশয়ে অতিথি পাখি আসে। এর মধ্যে, ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারের অভ্যন্তরের লেকটি সাধারণের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত এবং অন্য জলাশয়গুলো দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

এদিকে শীতের শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরের পাশের জলাশয়সহ চারটি জলাশয় পরিযায়ী পাখির কলতানে মুখর থাকলেও কিছুদিন পরেই তিনটি জলাশয় থেকে পরিযায়ী পাখিরা চলে গেছে। কোলঘেঁষে থাকা দোকানপাটের কোলাহল, দর্শনার্থীদের উৎপাত, আবাসস্থল সংকট এবং পার্শ্ববর্তী সড়কের যানবাহনের শব্দে এই জলাশয় থেকে পাখিরা চলে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ছবি- অরিত্র সাত্তার

পাখি বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতি বছর শীতের শুরুতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিযায়ী পাখি এসে থাকে। সাধারণত তীব্র শীত থেকে বাঁচতে হিমালয়ের পাশের অঞ্চল থেকে এখানে পরিযায়ী পাখি আসে। তবে দর্শনার্থীদের উৎপাত কম থাকার কারণে বিগত দুই থেকে তিন বছর ধরে ক্যাম্পাসে আসা পরিযায়ী পাখির সংখ্যা অন্যান্য বছরগুলোর তুলনায় বেশি ছিল। করোনা মহামারির কারণে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় দর্শনার্থীদের ভিড় কম থাকায় পরিযায়ী পাখির সংখ্যা বেড়েছিল। তবে এ বছর শীতের শুরুতে অনেক পাখি আসলেও দর্শনার্থীদের উৎপাতে আগেভাগেই ক্যাম্পাস ছেড়েছে তারা।

পাখি বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘গত দুই-তিন বছর দর্শনার্থীর উৎপাত কম থাকায় পরিযায়ী পাখি বেশি সংখ্যায় এসেছিল। তবে এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনার্থীদের যাতায়াত বেশি ছিল। ফলে তাদের উৎপাতে পরিযায়ী পাখি কমতে পারে। এবার ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলোতে ছোট সরালি ও বড় সরালি পাখি দেখা গেছে।’

বণ্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুল হাসান খান বলেন, উত্ত্যক্ত হওয়ায় পাখি চলে গিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত্রিকালীন কিছু অনুষ্ঠানে আতশবাজি ও পটকা ফুটানো এবং সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহারে পাখিরা বিরক্ত হয়েছে বলে মনে করছি। তবে এ বছর ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলোতে ছোট সরালি ও বড় সরালির পাশাপাশি আরও এক প্রজাতির পাখি দেখা গিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

কচুরিপানায় ভরা জলাশয়. ছবি- অরিত্র সাত্তার

এদিকে পরিযায়ী পাখির নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনের জলাশয় ও পরিবহন চত্বরের পেছনের জলাশয়সংলগ্ন এলাকায় গাড়ি পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, জলাশয়ের পাশে দোকানপাটে ভিড় কমানো ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আতশবাজি ও পটকা না ফুটানোর ওপর জোর দিয়েছেন এই দুই অধ্যাপক।

অধ্যাপক কামরুল হাসান বলেন, ‘প্রতিবছরই পরিবহন চত্বরের পাশের জলাশয়ে অনেক বেশি পাখি আসে। তবে জলাশয়ের পাড়ের ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে দোকানপাট। দোকানের পেছনের দিকে মানুষের ভিড় থাকে সবসময়। এই পরিযায়ী পাখিরা অল্পতেই ভয় পাই। তাই কোলাহল দেখে একরকম আতঙ্ক নিয়েই তারা চলে নির্জনে এলাকায় গিয়েছে।’

অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুল হাসান খান বলেন, ‘পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ রাখতে গাড়ি পার্কিং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত্রিকালীন অনুষ্ঠানে আতশবাজি ও পটকা ফুটানো এবং সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার সীমিত করতে হবে। পাশাপাশি দর্শনার্থীরা যাতে পরিযায়ী পাখিদের উৎপাত না করে- সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

অন্যদিকে পরিযায়ী পাখির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি জলাশয় লিজমুক্ত রাখা হয় বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, ‘পাখিদের জন্য জলাশয় প্রস্তুত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সচেতনতামূলক ব্যানার-ফেস্টুন তৈরি প্রভৃতি ক্ষেত্রে বছরে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়। পরিযায়ী পাখি বসার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি জলাশয় লিজ দেওয়া হয় না। এছাড়া পাখিদের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে প্রতি বছর পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনের জলাশয় ও পরিবহন চত্বরের পেছনের জলাশয়ের কচুরিপনা ও আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়।’

 

ইত্তেফাক/এমএএম/ইআ