ইতিহাসের স্বচ্ছ দর্পণ সংরক্ষণে অবহেলা নয়

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০৫

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যে কোনো জাতির শেকড়ের সন্ধান পাওয়া যায় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমে। প্রত্ন শব্দের অর্থ হচ্ছে পুরোনো বা প্রাচীন, আর এ সম্পর্কিত তত্ত্বকে বলা হয় প্রত্নতত্ত্ব। প্রাচীনকালের জিনিসপত্র, স্থাপত্য, মন্দির, মসজিদ, জমিদারের প্রাসাদ, পুরোনো পুকুর, মুদ্রা, গহনা, ধাতব অস্ত্র, পোড়ামাটি বা পাথরের ভাস্কর্য প্রত্নতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ৫১৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে ২ হাজারের অধিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে। 

বগুড়ার মহাস্থানগড়, কুমিল্লার ময়নামতি, নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, নরসিংদীর ওয়ারী-বটেশ্বর বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। সবচেয়ে বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে রাজশাহী অঞ্চলে। ১৪৮টি প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলের সন্ধান মিলেছে রাজশাহী বিভাগে। এছাড়া ঢাকা বিভাগে ১০৬টি, খুলনা বিভাগে ৮৬টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৬১টি, রংপুর বিভাগে ৫৬টি, বরিশাল বিভাগে ২২টি, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৮টি, সিলেট বিভাগে ১৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে। এসব প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। ব্রিটিশ সরকারের আমলে ১৮৬১ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া নামে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় প্রত্নতত্ত্ব প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কার্যালয় চালু হয় ঢাকায়। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুসন্ধান, খনন, সংস্কার, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও গবেষণার কাজ করা। বর্তমানে সারা দেশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ২৮টি জাদুঘর চালু রয়েছে। এসব জাদুঘরে দর্শনার্থীরা নানা অজানা ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন। বাংলার বহু অজ্ঞাত ইতিহাস প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনের কল্যাণেই জানার সুযোগ হয়েছে। 

প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ মূলত আমাদের সন্ধান দিয়েছে প্রাচীন ইতিহাসের। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে প্রাপ্ত মুদ্রা থেকে জানা গেছে বিভিন্ন রাজার শাসনকাল, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার চিত্র। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের গায়ে পোড়ামাটির যেসব ফলকচিত্র পাওয়া গেছে তার মাধ্যমে বাংলা মৃশিল্পীদের অনুপম কারুকার্যের দক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে। পাল আমলে নির্মিত সীতাকোট বিহার, জগদ্দল বিহার, সোমপুর বিহার, আনন্দ ভাসুবিহার, বিক্রমশীলা মহাবিহারের মতো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমে সেই যুগে বৌদ্ধসংস্কৃতির বিকাশের পরিচয় পাওয়া যায়। কান্তজির মন্দিরের দেওয়ালে করা পোড়ামাটির শিল্পকর্ম পৌরাণিক কাহিনি ও তৎকালীন সমাজব্যবস্থার পূর্ণ প্রতিচ্ছবি বহন করছে। আঠারো শতকে দিনাজপুরের কান্তনগরের মহারাজ প্রাণনাথ ও তার পুত্র প্রায় ১৮ বছর ধরে নান্দনিক এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। ইটপাথরে তৈরি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ সুলতানি আমলের স্থাপত্য। সুলতান হুসাইন শাহ পনেরো গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। নরসিংদীর ওয়ারী-বটেশ্বর মাটির নিচে আবিষ্কৃত একটি দুর্গনগরী, যা আড়াই হাজার বছরের পুরোনো। এছাড়া ঢাকার সাত গম্বুজ মসজিদ, আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, রোজ গার্ডেন, রূপলাল হাউজ, নারায়ণগঞ্জের পানাম সিটি, মানিকগঞ্জের বালিয়াটি প্রাসাদ, মুন্সীগঞ্জের বাবা আদম মসজিদ, কিশোরগঞ্জের কুতুব মসজিদ, চন্দ্রাবতী মন্দির, টাঙ্গাইলের আতিয়া মসজিদ, ফরিদপুরের মথুরাপুর দেউল, ময়মনসিংহের শশী লজ, শেরপুরের নয়আনী জমিদার বাড়ি, চট্টগ্রামের শমসের গাজীর কেল্লা, কুমিল্লার শালবন বিহার, সিলেটের শ্রী চৈতন্য মন্দির, বরিশালের কসবা মসজিদ, রাজশাহীর বাঘা মসজিদ, নওগাঁর বৌদ্ধবিহার, নাটোরের দীঘাপতিয়া রাজবাড়ি, পাবনার জোড়বাংলা মন্দির, বগুড়ার মহাস্থানগড়, বৈরাগীর ভিটা, পরশুরামের প্রাসাদ, রংপুরের তাজহাট জমিদার বাড়ি, দিনাজপুরে রামসাগর মন্দির, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, নড়াইলের জোড়বাংলা মন্দির বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে সমধিক পরিচিত। 

বলে রাখা দরকার, দেশের বিভিন্ন জায়গায় অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এখনো বেদখল ও শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে। এসব স্থান দখলমুক্ত করার জন্য কঠোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো যথাযথ সংস্কার করে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের পর্যাপ্ত জনবলের অভাবের কথাও শোনা যায়, যার ফলে যথাযথ সংস্কার, সংরক্ষণ ও দেখভালের কাজটি বিঘ্নিত হচ্ছে। এ অবস্থায় পর্যাপ্ত জনবলের পাশাপাশি পেশাদার দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের স্বচ্ছ দর্পণ। প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনের মধ্যে আমরা আত্মপরিচয় খুঁজে পাই। এসব নিদর্শন আমাদের ঐতিহ্য ও গর্বের জায়গা। তাই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণে আরো কার্যকর পদক্ষেপ কাম্য। 

লেখক : শিক্ষার্থী, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন