কাকে বলে সফলতা?

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০৩

একটা সময় ছিল যখন আমাদের জীবনে পড়াশোনাটাই মূল লক্ষ্য ছিল না। শৈশবের দুরন্তপনায় তখন আমরা মেতে থাকতাম। জীবনে কোনো কিছুর প্রতি আমরা কোনো চাপ নিতাম না। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে যাওয়া, ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে খেলার মাঠে দৌড়। হাসি-তামাশা আর রংধনুর মতোই রঙিন জীবন পার করতাম আমরা। আমাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যেন বদলে যেতে থাকল সেই দুরন্তপনার শৈশব। পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে বর্তমান যুগের শিশুদের শৈশবে। ভিন্নতা দেখা দিয়েছে আমাদের সে যুগ আর বর্তমান যুগের শিশুদের জীবনযাপনে।

বর্তমান যুগের শিশুদের জন্মের পরই কেড়ে নেওয়া হয় তাদের সুন্দর শৈশবটাকে। আর নামিয়ে দেওয়া হয় এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। শৈশবের মাঠে হেসে-খেলে পার করার দিনগুলোতে তাদের ক্লাস, কোচিং আর প্রাইভেট টিউটরের কাছে উৎসর্গ করতে হয়। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় তাদের নামিয়ে দিয়ে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত করছি তাদের সুস্থ স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনটাকে। জীবনে আসলে পড়ালেখাই মুখ্য বিষয় নয়। পড়াশোনার পাশাপাশি চিত্তবিনোদনেরও যথেষ্ট দরকার আছে। মানসিক বিকাশের জন্য চিত্তবিনোদন অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান যুগের বাবা মায়েরা তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে সে সময়টা দিতে চান না। জন্মের তিন বছর পরই তাদের পিঠে চাপিয়ে দেওয়া হয় এক গাদা বই, যার ভার বহন করতে গিয়ে সোনালি শৈশবটাকে মলিন করে তুলতে হচ্ছে ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুদের।

‘জিপিএ-৫’ নামক এক অসুস্থ সফলতার দিকে হেঁটে চলেছে বর্তমান সমাজ। এখনকার যুগের বাবা মায়েদের না কি সম্মান জড়িয়ে থাকে সন্তানদের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ রেজাল্টের ওপর। কোনোভাবে যদি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে শুরু হয় কোমলমতি শিশুদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। আর এগুলো কারা করে? তাদের বাবামায়েরাই। প্রত্যেক বাবা-মাই চান তাদের সন্তান ক্লাসে ফার্স্ট হোক। প্রত্যেকটি পাবলিক পরীক্ষায় যেন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। আবার কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে সাধারণ বৃত্তি কেন পেল, ট্যালেন্টপুলে কেন পেল না, তা নিয়েও অনেক অপমান অত্যাচার করা হয়। এই জিপিএ-৫-এর জন্য একের পর এক কোচিং, প্রাইভেট, এক্সট্রা ক্লাসে পাঠানো হয় তাদের। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনেও অবসর থাকে। কিন্তু এখনকার যুগের বাচ্চাদের জীবনে কোনো অবসর থাকে না। খেলাধুলা, ব্যায়াম,  ঘোরাঘুরি এগুলো এখনকার বাবা-মায়েদের মতে সময় নষ্ট। কিন্তু বোকা বাবা মা একবারও ভেবে দেখেন না যে, তারা আসলে এভাবে তাদের সন্তানের জীবন ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে। ধ্বংস করছে শিশুদের শৈশব, কৈশোরের রঙিন দিনগুলো। বাধা সৃষ্টি করছে শিশুদের মানসিক বিকাশে। 

উচ্চমাধ্যমিকের পর জিপিএ-৫-এর সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতাই শেষ নয়। এরপর তাদের সম্মুখীন হতে হয় আরো বড় যুদ্ধের। যার নাম ভর্তিযুদ্ধ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সিট সে যেন সোনার হরিণ। দিন দিন এই প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। সারা বাংলাদেশের সব সরকারি মেডিক্যাল, সরকারি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে সব মিলিয়ে মাত্র ৬৪,০০০ আসন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের তুলনায় আসন সংখ্যা খুবই নগণ্য। আর এই সীমিত আসন দখল করার জন্য প্রতি বছর ভর্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে লাখ লাখ শিক্ষার্থী। উচ্চমাধ্যমিকের পর ছুটি কাটাবে তো দূরের কথা, কলেজে পড়াকালীন একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের ভর্তি প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করতে হয়। এইচএসসির পর তা শুরু হয় পুরাদমে। কঠোর পরিশ্রম করার পরও অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। যেহেতু শিক্ষার্থীদের তুলনায় আসন সংখ্যা খুবই কম, তাই সবাই পরিশ্রম করলেও চান্স পাবে না। কিন্তু এটা আমাদের সমাজ, পরিবার, আত্মীয়স্বজন মানতে চান না। তাদের মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেলে তার কোনো কোয়ালিটিই নেই। আর যদি শিক্ষার্থী সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের হয়, তবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সে যত ভালো সাবজেক্ট নিয়েই পড়ুক না কেন, সমাজ তাকে মেডিক্যাল, বুয়েট নিয়ে প্রশ্ন করবেই। এসব আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে নিজেদের সম্মান বজায় রাখতে বাবা-মায়েরা এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় বলি দেন, তাদের কোমলমতি সন্তানদের।

সত্যিই এখন আমরা ভুলে গেছি যে, শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য জ্ঞান অর্জন, মনুষত্ববোধ জাগ্রতকরণ, সুনাগরিক হওয়া। তা ভুলে আমরা এখন মুখস্থবিদ্যার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছি।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বাঁচাতে আমাদের সবার এখনই সোচ্চার হওয়া উচিত। শিশুদের পর্যাপ্ত মানসিক বিকাশের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি পর্যাপ্ত খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও ভ্রমণে সময় দেওয়া উচিত। শিশুদের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি না করে তাদের মতামতকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তবেই ঘটবে মানসিক বিকাশ, জাগ্রত হবে মনুষ্যত্ববোধ এবং জীবন হবে সুন্দর ও উপভোগময়।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন