শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দুরন্ত শৈশব ও একালের শিশু

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০৪

আগের সেই রঙিন দুরন্ত শৈশব এখনকার সময়ে কদাচিৎ দেখা যায় শিশুদের মধ্যে। মাঠ-ঘাট-গাছ-নদী-পুকুরে দাপিয়ে বেড়ানো যেন আজকাল শিশুদের জন্য কেবলই স্বপ্ন। তবে গ্রামের শিশু-কিশোরদের এখনো দুরন্তপনায় মেতে থাকতে দেখা যায়, তবে তাও আগের মতো নয়। আধুনিক প্রযুক্তির হওয়া শহর থেকে মফস্বলেও পৌঁছে গেছে। এখন মোড়ে মোড়ে শিশুদের দোকান কিংবা টংয়ে বসে মোবাইলে লুডু, ফ্রি-ফায়ার ইত্যাদি সব গেম খেলতে দেখা যায়। স্মার্ট টিভি, স্মার্ট ফোন কিংবা স্মার্ট কত শত ডিভাইসের আড়ালে শৈশবের সেই রঙিন দিনগুলো স্মৃতি হতে বসেছে। আজ শিশুর বিনোদনের খোরাক জোগায় স্মার্টফোনের স্কিন। এটিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও দেখে কিংবা গেম খেলে শিশুর রঙিন সময়গুলো হয়ে উঠছে বিবর্ণ। যেখানে একটি শিশুর সময় কাটার কথা, সবুজ দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে খেলাধুলায় মেতে থেকে কিংবা পুকুরে দাপিয়ে সাঁতার কেটে অথচ সে দৃশ্যগুলো যেন আজ কেবল স্মৃতি। 

এই যে শিশুদের খেলার জন্য দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠের কথা বললাম, তা তো আমরা দিনদিন নিঃশেষ করে ফেলছি। তারা খেলবে কোথায়! খেলার মাঠ দূরে থাক, শিশুরা কোনায়, চিপায়-চাপায় যে জায়গাটুকুতে খেলত, তাও নির্দ্বিধায় দখল করে গড়ে তুলছি উঁচু উঁচু দালান। আজ স্মার্ট বাবা-মায়ের হাতে সময় হয় না শিশুর খেলার সঙ্গী হওয়ার। কান্না, রাগ কিংবা অভিমানে শিশুর হাতে নিজের মোবাইল ফোনটি তুলে দিয়ে চিন্তামুক্ত হতে চান তারা। কিন্তু এই ডিভাইসটি যে আমাদের ভবিষ্যৎ ফ্যাকাশে করে দিচ্ছে, সেটি কি আমরা চিন্তা করি?

যৌথ পরিবারে আগে শিশুর সময় কাটত পরিবারের সবার সঙ্গে মিশে হই-হুল্লোড়ে। সবার আদর-স্নেহ-মমতায় সে নিজেকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার প্রয়াস পেত। বাড়ির আঙিনা, গ্রামের মাঠঘাট কিংবা পুকুরে দাপিয়ে বেড়াত শিশু। সঙ্গীদের নিয়ে কখনো সে আম কুড়াতে যেত, যেত নদীতে সাঁতার কাটতে কখনো-বা ছোট ছোট জাল বা বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে। দল বেঁধে গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ দিয়ে স্কুলে যেত সে। স্কুলে ক্লাসের ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়-কানামাছি-বউচিসহ হরেক রকমের খেলায় সময় যেত শিশুর। বিকালে গ্রামের মাঠগুলোতে জায়গা হতো না শিশুদের জন্য। পাঠশালায় আনন্দঘন পরিবেশে পাঠ গ্রহণ করত তারা। শিশুদের মধ্যে ছিল না বোর্ড পরীক্ষায় জিপিএ-৫ কিংবা ক্লাসে সেরা হওয়ার প্রতিযোগিতা। 

আজকাল পরিবারগুলো ছোট হয়ে যাওয়ায় দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, কাজিনসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের তেমন সঙ্গ পাওয়া হয়ে ওঠে না শিশুর। কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকায় বাবা-মায়ের সঙ্গেও শিশু ভালোভাবে সময় কাটাতে পারে না। আবার অধিকাংশ কর্মস্থলে ডে-কেয়ারের ব্যবস্থা না থাকায় শিশুকে বাড়িতে কাজের বুয়ার কাছে রেখে যেতে হয় বাবা-মাকে। শহরের চার দেওয়ালে শিশুর সময় কাটে ফোনের স্ক্রিনে নয়তো টিভিতে কার্টুন দেখে। অভিভাবকদের বোঝা উচিত, আপনার শিশুর শিক্ষা গ্রহণ কেবল জিপিএ-৫-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তার শিক্ষিত হয়ে ওঠা যেন একজন ভালো মানুষ হওয়ার জন্য হয়। জিপিএ-৫ পেয়ে আপনার সন্তান যদি প্রকৃত মানুষ না হয়ে ওঠে, কর্মস্থলে গিয়ে সে অসদুপায়ে আয় করতে দ্বিধা বোধ করবে না। কিন্তু সে যদি এক জন আদর্শ মানুষ হয়ে ওঠে, জিপিএ-৫ না পেয়েও সে দেশ ও জাতির কল্যাণে সচেষ্ট হবে।

এজন্য পরিবারে বাবা-মাকে তার শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে যত্নশীল হতে হবে। সময় করে শিশুকে বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে। শহরগুলোতে শিশুদের জন্য বিনোদনের সুব্যবস্থা রাখতে হবে। খেলার মাঠ বাড়াতে হবে। শিশুকে সাঁতার শেখাতে হবে। শিশু যেন আনন্দদায়ক পরিবেশে শেখে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তার হাতে বই দিন। ক্লাসে সেরা হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেবেন না তাকে। সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করুন শিশুকে। যদি আঁকিবুঁকি করতে চায়, আঁকতে দিন। লেখালেখি করতে চাইলে, তা-ই দিন। তার মনের ইচ্ছাগুলো জানুন। সে পরীক্ষায় ভালো করতে না পারলে তার সঙ্গে বাজে ব্যবহার নয়, তাকে উত্সাহ দিন। পাঠ্য বইয়ের মধ্যে শিশুকে আবদ্ধ না রেখে তাকে মজার মজার বই পড়তে দিন। গল্প করুন তার সঙ্গে। সংবাদপত্র তুলে দিন শিশুর হাতে। জানি, সে পত্রিকার অনেক কিছুই বুঝবে না। কিন্তু পত্রিকায় আঁকা ছবি, বড় বড় শিরোনাম, রঙিন গ্রাফিক্স ইত্যাদি তাকে পত্রিকা পড়ার দিকে আকর্ষণ করবে। এতে একসময় শিশুটি পত্রিকা পড়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। শিশুরা পড়ছে গাছ লাগানোর কথা, বার্ষিক পরীক্ষা শেষে নৌকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কিংবা আমার জীবনের লক্ষ্য ইত্যাদি। কিন্তু আমরা কি তাকে গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করি? তাকে নৌকা ভ্রমণের সুযোগ করে দিই কখনো কি জানতে চেয়েছি তার কী হতে ইচ্ছে করে? বা কোন বিষয়টি তার পড়তে বেশি ভালো লাগে! সে শুধু নোট-গাইড দেখে অন্যের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা মুখস্থ করে যাচ্ছে, পড়ে যাচ্ছে বড় হয়ে একদিন সে ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার হবে। 

শিশুকে শুধু বই নয়, প্রকৃতি-পরিবেশ থেকেও শিখতে দিন। স্মার্ট সব ডিভাইস কিংবা চাপিয়ে দেওয়া ছকবাঁধা রুটিন যেন তার দুরন্ত শৈশব নিষ্প্রভ করে না দেয়, সেদিন খেয়াল রাখতে হবে অভিভাবকদের।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন