বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বাংলাদেশ কি উপগ্রহচিত্র ব্যবহার করে উপকৃত হতে পারে?

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:১৯

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর বাংলাদেশ হিমালয়ের পাদদেশের দক্ষিণ ও বঙ্গোপসাগরের উত্তর অংশে অবস্থিত। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে সামান্য পাহাড়ি অঞ্চল হলেও পলল সমভূমি দ্বারা গঠিত বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ। নদীমাতৃক বাংলাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য নদীনালা, বিল, হাওর-বাঁওড়, টিলা, পাহাড়, সমুদ্রসৈকত, বন, চা-বাগান, ইত্যাদি পরিবেশগত বৈচিত্র্য বহন করে। অনেক ভালো কাজের জন্য বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়ার অন্যতম উল্লেখযোগ্য এবং সাফল্যের গল্পে পরিণত হয়েছে। 

দেশটি একবিংশ শতাব্দীতে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর জাতিতে পরিণত হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দেশটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারার সঙ্গে সংগতি রেখে, কিছুটা হলেও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, উন্নয়নমূলক কাজে ও দুর্যোগ মোকাবিলায় উপগ্রহের চিত্র ব্যবহার করে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ বন বিভাগ ভূমি আবরণ ও ভূমি  ব্যবহার মানচিত্র প্রণয়ন, নতুন বনায়ন ও বন উজাড় এলাকা শনাক্তকরণ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের উদ্দেশ্যে দূর-অনুধাবন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। তেমনি স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর-অনুধাবন প্রতিষ্ঠান, সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস, ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংসহ অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নানাবিধ কাজে উপগ্রহ চিত্র, দূর-অনুধাবন ও ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থাপদ্ধতি ব্যবহার করে আসছে।  

উল্লেখ যে, দূর-অনুধাবন প্রযুক্তি যুগের সূচনা হয়েছিল ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর, যখন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ, স্পুটনিক-১-এর উৎক্ষেপণ করেছিল। সেই মহাকাব্যিক মুহূর্ত থেকে এখন পর্যন্ত কৃত্রিম উপগ্রহ ও তার চিত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহের কোনো শেষ নেই। কারণ পৃথিবী পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম উপগ্রহ আইকনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টি উভয়ই প্রদান করে আসছে। উপগ্রহ চিত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো কোনো দূর-অনুধাবন বিশেষজ্ঞ ও পেশাদার মনে করেন যে, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ রেজুলেশনের উপগ্রহ ছবি ব্যবহার করা উচিত। অনেকেরই একটা সাধারণ ধারণা রয়েছে যে, অতি উচ্চ-রেজুলেশনের বাণিজ্যিক চিত্র ক্রয় করে ব্যবহার করলেই মানচিত্রায়ণ নিখুঁত হওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং দেশের কল্যাণে মানচিত্র ব্যবহৃত হতে পারে। সাধারণ বাস্তবতা হলো উপগ্রহচিত্রভিত্তিক ম্যাপিংয়ের কাজে এমন ধারণা অনেক সময় সঠিক নাও হতে পারে। উপগ্রহচিত্রভিত্তিক মানচিত্রায়ণের নির্ভুলতা উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। সেই সঙ্গে এটি উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণের সফটওয়্যারের ওপর অভিজ্ঞতার ও দূর-অনুধাবন চিত্র বিশ্লেষণের অ্যালগরিদম ব্যবহারের ওপরও নির্ভর করে। এক্ষেত্রে উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষক প্রশিক্ষিত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ হলে বিনা মূল্যে সংগৃহীত উপগ্রহচিত্র দিয়ে ক্রয়কৃত উপগ্রহ চিত্রের প্রায় সমতুল্য মানের মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।  

এটা সত্যি যে, উচ্চ রেজুলেশন উপগ্রহচিত্রগুলো বেশি পরিষ্কার থাকায় খালি চোখে দেখা বা পর্যবেক্ষণমূলক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কিছু বেশি সুবিধা রয়েছে। তবে অন্যদিকে উচ্চ রেজুলেশন উপগ্রহচিত্রগুলো ব্যবহার করার বিশেষ অসুবিধা হলো যে, সেগুলো ব্যয়বহুল, যেমন প্রতি বর্গ কিলোমিটার ইমেজ কিনতে আনুমানিক ১৫ মার্কিন ডলারের মতো দরকার হতে পারে। 

সেই কারণে যে কোনো মাস বা বছরের জন্য যত ইচ্ছা তত চিত্র কেনা বেশ অর্থসাপেক্ষ। বাণিজ্যিকভাবে যে কোনো উপগ্রহচিত্র কেনার জন্য, অনেক ক্রয় পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা অনেক সময়সাপেক্ষ। উদাহরণস্বরূপ, ফসলের ধরন মানচিত্রায়ণের জন্য সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে উপগ্রহ চিত্র ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে, তেমনি বন্যার সময় দ্রুত উপগ্রহ চিত্রের দরকার হয়। অত্যন্ত উচ্চ রেজুলেশন উপগ্রহচিত্র ফাইলের আকার অনেক বেশি, যে কারণে চিত্র বিশ্লেষণের জন্য শক্তিশালী কম্পিউটার প্রয়োজন। এছাড়া যেহেতু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশির ভাগ উচ্চ রেজুলেশন উপগ্রহ উেক্ষপণ করা হয়েছে। তাই উচ্চ রেজুলেশন উপগ্রহচিত্র অতীতের দীর্ঘমেয়াদি ভূমি ও গাছপালার পরিবর্তন দেখার জন্য উপযোগী নয়, বিশেষ করে ২০০০ সালের আগে তেমন কোনো মালটি স্পেকট্রাল চিত্র আর্কাইভ নাই।

ফ্রি উপগ্রহ চিত্রের আরেকটি সুবিধা হলো, যে কোনো সময় কোনো রকমের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া সংগ্রহ করা যায়। অতএব, যেসব প্রতিষ্ঠান উপগ্রহ চিত্রভিত্তিক মানচিত্র প্রণয়নে কাজ করে, এমন সংস্থাগুলো ওপরে উল্লিখিত বিনা মূল্যের উপগ্রহ চিত্রগুলো ব্যবহারের ব্যাপারে চিন্তা করতে পারেন। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে নজর দিতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, দূর-অনুধাবন প্রতিষ্ঠানগুলো গুগল আর্থ-ইঞ্জিন ব্যবহার করে রিমোট-সেন্সিং ডেটা বিশ্লেষণে দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব আরোপ করতে পারেন। এক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন অধিদপ্তর ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের জন্য দূর-অনুধাবন প্রশিক্ষণের ওপর আরো জোর দিতে পারেন। এছাড়াও, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগগুলো দেশি ও বিদেশি রিমোট সেন্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে পারেন। মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনা মূল্যে উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করার সফটওয়্যারের ওপর গুরুত্ব দিতে পারেন।

যেমন, গুগল আর্থ-ইঞ্জিন একটি অনলাইনভিত্তিক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং সিস্টেম, যা ল্যান্ডস্যাট এবং সেন্টিনেল উপগ্রহসহ বিভিন্ন পেটাবাইট পরিমাণ বিনা মূল্যের চিত্র অবাণিজ্যিক কাজে বিশ্লেষণ করার জন্য বিনা মূল্যে সুযোগ দিয়ে থাকে, যা যে কোনো ধরনের কম্পিউটার, এমনকি একটি মোবাইল ফোন ডিভাইস থেকে ব্রাউজারের মাধ্যমে অ্যাক্সেস করা যায়। গুগল আর্থ-ইঞ্জিনের সবচেয়ে ভালো দিক হলো উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণের জন্য উচ্চক্ষমতার ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন পড়ে না, এমনকি ডেস্কটপ কম্পিউটারে ডাউনলোড করার প্রয়োজন পড়ে না।

কোনো বিশেষ কারণে কোনো প্রকল্পের জন্য খুব অতি উচ্চ রেজুলেশনের ছবি প্রয়োজন হয়, এক্ষেত্রে, অনুমতি সাপেক্ষে ড্রোন দিয়ে মালটিস্পেকট্রাল চিত্র গ্রহণ করা যেতে পারে। ড্রোনের সুবিধা হলো—একবার একটি ড্রোন ক্রয় করা হলে, সেই সংস্থা ড্রোনকে অনেক কাজে বহু বার ব্যবহার করতে পারে। এতে করে প্রকল্পের অর্থ যেমন কম ব্যয় হবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার কম হতে পারে।

উল্লেখ যে, উপগ্রহচিত্রের ব্যবহারের ক্ষেত্রে ১৯৭২ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভূতাত্ত্বিক জরিপ/নাসা কর্তৃক উেক্ষপিত ল্যান্ডস্যাট উপগ্রহ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞাত সিদ্ধান্ত নিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। এর পর থেকে পৃথিবীর চিত্র গ্রহণের জন্য বাণিজ্যিক এবং অবাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো দ্বারা অনেক কৃত্রিম উপগ্রহ উেক্ষপণ করা হয়েছে। তবে ২০০৮ সালের শেষের দিকে বিশ্বব্যাপী সমস্ত ব্যবহারকারীর জন্য ল্যান্ডস্যাট উপগ্রহ চিত্রের বিনা মূল্যে বিতরণ বৈজ্ঞানিক ব্যবহারের জন্য আরেকটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। ২০১৪ সালে আরেকটি সুখবর ছিল—কোপার্নিকাস সেন্টিনেল উপগ্রহ উেক্ষপণ। কোপার্নিকাস হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের পৃথিবী পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি। প্রোগ্রামটি ইউরোপীয় কমিশনের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর দ্য স্পেস প্রোগ্রাম দ্বারা ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা, ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বে সমন্বিত এবং পরিচালিত হয়। আকাশে উেক্ষপণ থেকে অদ্যাবধি কোপার্নিকাস সেন্টিনেল উপগ্রহচিত্র বিনা মূল্যে সবার জন্য উন্মুক্ত এবং পরিবেশসংক্রান্ত তথ্যসেবা বাস্তবায়নের জন্য কোপার্নিকাস হলো একটি ইউরোপীয় উদ্যোগ। কোপার্নিকাস সেন্টিনেল উপগ্রহ চিত্রগুলো নদীর গতিপথ পর্যবেক্ষণ, প্লাবনভূমির ম্যাপিং, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ, হিমবাহ, তুষার এবং ভূমি আবরণ ও ব্যবহার মানচিত্রায়ণ পরিবর্তনগুলো নির্ধারণ করার জন্য বিশেষভাবে কার্যকর। 

সেই কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থাগুলো প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন ফসলের ধরন মানচিত্রায়ণ, বন ও অন্যান্য গাছপালার অবস্থার পর্যবেক্ষণ ও আচ্ছাদন পরিমাপসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা উদ্যোগের জন্য বিনা মূল্যের উপগ্রহচিত্রগুলো ব্যবহার করতে পারে। সর্বোপরি, যে কোনো ধরনের উপগ্রহচিত্রভিত্তিক কাজের পরিসর বাড়ানো ও প্রয়োগের জন্য অতিরিক্ত বাজেট, দক্ষ জনশক্তির তৈরি এবং গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, ইসিমোড, নেপাল

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন