বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৬ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্যারিয়ার ভাবনা

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:১৫

বাংলাদেশে সমকালীন প্রেক্ষাপটে তরুণদের ক্যারিয়ার ভাবনা একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যারিয়ার বলতে জীবিকা অর্জনের উপায় বা বৃত্তি, জীবনায়ন ইত্যাদিকে বুঝায়। সুশিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত একটি নিশ্চিত ক্যারিয়ারই দিতে পারে ব্যক্তির জীবন যাপনে পর্যাপ্ত আর্থিক নিশ্চয়তা, সামাজিক মর্যাদা, সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তাই নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ না করলে ভবিষ্যতে সম্মুখীন হতে হয় নানামুখী বিপত্তির। ক্যারিয়ার বাছাইয়ে কেউ অর্থ, কেউবা স্বপ্নকে প্রাধান্য দেন। কিন্তু শুধু অর্থ বা শুধু স্বপ্নকে নয়, প্রাধান্য দিতে হবে উভয়কেই। সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনের নিশ্চয়তার জন্য ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে হবে শুরু থেকেই।

বর্তমান সময়ে সচেতন বাবা-মাও সন্তানের ক্যারিয়ারের দিকে মনোনিবেশ করে থাকেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবকরা নিজেদের স্বপ্নকে সন্তানের ক্যারিয়ারের ওপর এমনভাবে চাপিয়ে দেন যে, তা সন্তানের জন্য হয়ে ওঠে সাফল্যের বড় অন্তরায়। বলা বাহুল্য, শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই ঐ শিশুর বাবা-মা তার ক্যারিয়ার নিয়ে রীতিমতো অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন আঠারো আনা অধিকার নিয়ে! সন্তানরাও নিজেদের বাধ্য ও সুসন্তান হিসেবে পরিচিত করতে অগাকান্তের মতো তাদের স্বপ্নপূরণে ব্রতী হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সন্তানরা কী হতে চায়, তাদের সাধ্য কতটুকু—এসবের তোয়াক্কা করা হয় না। সন্তানরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পিতা-মাতার স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন হিসেবে লালন করে সাধ্যের বাইরে গিয়ে। কী অদ্ভুত কথা! 

অস্বীকার করার উপায় নেই, কাঙ্ক্ষিত ফলাফল করতে না পারলে সন্তানদের সহ্য করতে হয় পিতা-মাতার তাচ্ছিল্যসূচক বাক্য, অন্যের সঙ্গে তুলনা, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সন্তানের ‘ভালো’ ক্যারিয়ারের জন্য তারা যে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করেন, তা সন্তানের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার কারণ। মনে রাখতে হবে, জীবনের আসল উদ্দেশ্য ক্যারিয়ারের  পেছনে দৌড়ানো নয়, বরং যাবিত জীবনকে আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করা। ক্যারিয়ারে সফল হতে বা সফল ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার এই রিলে রেইসে আমরা যেন ভুলেই যাই—আর্ট ইজ লং, লাইফ ইজ শর্ট তথা বিদ্যা অনন্ত, জীবন সংক্ষিপ্ত। ভাবুন তো একবার—এই সংক্ষিপ্ত জীবনে আমরা শিক্ষার উদ্দেশ্য কতটুকু প্রয়োগ করতে পারি? ক্যারিয়ার নির্বাচনের প্রেক্ষাপটেও বলা যায়, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল সার্টিফিকেট অর্জন নয়, বরং ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলির পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে মানুষকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। চাকরি পাওয়া বা না পাওয়ার সঙ্গে এটি সম্পর্কিত, তবে মুখ্য বিষয় নয়। বিষয়টি আমরা বুঝতে পারি না বলেই দেশে এতো শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত বেকার। 

ছোট থেকে নির্বাচন করা কিছু কমন ক্যারিয়ার বেছে নিয়ে হুমড়ি খেয়ে সেই গড্ডালিকা প্রবাহ অনুসরণ করে চলি আমরা সবাই। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বা ক্যাডার সার্ভিস ছাড়া যে আরো অনেক ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব, তা যেন আমরা মানতে নারাজ! ক্যারিয়ারের দৌড়ে যারা সফল হয়, তারা যেন অমাবস্যার চাঁদ পায়।  কিন্তু যারা ব্যর্থ হয়, তারা হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হয়—এমনটি কেন হবে! এই অবস্থায় ক্যারিয়ার নিয়ে প্রথাগত ভাবনা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে সর্বাগ্রে। ভুলে গেলে চলবে না, স্বাবলম্বন সর্বশ্রেষ্ঠ অবলম্বন। নিজে চাকরির জন্য না ছুটে বরং উদ্যোক্তা হয়ে চাকরি প্রার্থীদের কর্মক্ষেত্রের সুযোগ করে দেওয়ার মতো যোগ্যতা ও মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, কোনো পেশাই ছোট নয়। কোনো পেশাকেই ছোট করে না দেখার মানসিকতা ক্যারিয়ার ভাবনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে নিঃসন্দেহে। সত্যিকার অর্থে একটি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য মানুষের চলার পথ ও গতিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগের মধ্য দিয়েই ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে হবে। বাস্তবমুখী হয়ে ক্যারিয়ার নির্বাচন করতে পারলেই সার্বিক উন্নয়নে এগিয়ে যাব আমরা—এগিয়ে যাবে দেশ।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন