বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

পিস ক্যাফে: শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ভিন্ন উদ্যোগ

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৩, ১৫:১৮

'ক্যাফে' শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এমন কোনো স্থানের ছবি, যেটি আড্ডা কিংবা হুইহুল্লোড়ে পরিপূর্ণ। সেখানে গান, কথা, অল্পবিস্তর খানাপিনা সহ বর্ণিল আলোকসজ্জার সমাহার থাকবে, এমনটাই জেনে ও শুনে এসেছি আমরা। কিন্তু 'পিস ক্যাফে' আবার কেমন ক্যাফে, নাম শুনলেই প্রশ্ন জাগে। আবার, এই ক্যাফে কেমন করে সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে? বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের কর্মকর্তারা। তারা বললেন, 'জঙ্গিবাদ, সহিংসতা বা সন্ত্রাস-জাতীয় শব্দগুলো আমরা জানি, এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কেও ধারণা রাখি। তবে এধরনের শব্দগুলো সবার মাঝেই ভীতিসঞ্চার করে। বর্তমান সময়ে যেকোনো উগ্রবাদের বিরুদ্ধে জোর আলোচনা চলছে। কিন্তু সরাসরি এই শব্দগুলোকে সামনে না এনে আমরা চেয়েছি ভিন্ন কোনো উদ্যোগের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার বার্তা দেবো। যার মূল উদ্দেশ্য, সহিংসতা প্রতিরোধ। আর শিক্ষার্থীরাই পরিচালনা করছে 'পিস ক্যাফে', সেইসঙ্গে মিলছে অভিজ্ঞতা অর্জন ও বড় পরিসরে কাজের সুযোগ।'

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস (সিপিজে) এবং জাতিসংঘের নারীবিষয়ক কর্মসূচি ইউএন উইমেন যৌথভাবে 'পিস ক্যাফে' গড়ে তুলেছে। জাপান সরকারও অর্থায়ন করেছে এতে। বর্তমানে দেশের ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিস ক্যাফে সক্রিয়। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন। পিস ক্যাফে প্রচলিত ধরনের কোনো ক্যাফে নয়, বরং তাদের কাজ সম্মিলিত আলোচনার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর ক্ষমতায়ন, উদ্ভাবনী চিন্তার প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে বিভিন্ন কমিউনিটির নারীদের নিয়ে কাজ ও উদ্যোক্তা তৈরিতে সৃষ্টিশীল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সামনে এগিয়ে যাওয়া।

২০১৭ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস (সিপিজে)। এটি একটি বহুমুখী সংস্থা, যা গবেষণা, প্রশিক্ষণ, শিক্ষাদান কর্মসূচি, এবং অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। প্রখ্যাত জননীতি সংস্কার বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মনজুর হাসান সিপিজে'র নির্বাহী পরিচালক। তাঁর মতে, ব্র্যাক এবং অন্যান্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা মোকাবেলায় সক্রিয়ভাবে কাজ করে। তবে সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বা দক্ষতা অর্জনের চর্চা খুব একটা ছিল না বললেই চলে। পিস ক্যাফে সেই সুযোগ করে দিয়েছে অন্তত ৭০০ জন শিক্ষার্থীকে। তাদের প্রত্যেকে ক্যাম্পাসের বাইরেও নিজ-নিজ এলাকায় নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার, লিঙ্গসমতা, শান্তি-সম্প্রীতির বিকাশ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক জ্ঞান প্রদানে কাজ করছে। দেশের প্রায় ২৩টি জেলায় পিস ক্যাফের সদস্যরা এ সকল ধারণা ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে।

Peace Cafe 2

সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের (সিপিজে) যোগাযোগ কর্মকর্তা ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, প্রথমধাপে মাঠপর্যায়ে ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কৰি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পাইলট প্রকল্প হিসেবে পিস ক্যাফে স্থাপন করা হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পিস ক্যাফে গঠন করা হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করতে চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনকেও যুক্ত করা হয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পিস ক্যাফে এখন একটি ক্লাবে পরিণত হয়েছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস ক্যাফের বর্তমান প্রেসিডেন্ট তাহমিনা আক্তার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেও সবসময় তিনি অন্যের সেবা করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় খুব বেশিদূর যেতে পারেননি। অথচ পিস ক্যাফে-তে আরও ১৫০ জন সঙ্গীকে নিয়ে তিনি এখন হাজারো মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছেন। এখন পর্যন্ত, প্রায় ১১০০ শিক্ষার্থীকে দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিয়েছে পিস ক্যাফে। এর পাশাপাশি বিভিন্নধরনের সামাজিক সমস্যা মোকাবেলায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

Peace Cafe 1

সেন্টার ফর পিস আ্যান্ড জাস্টিসের নির্বাহী পরিচালক মনজুর হাসান বলেন, দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বয়স ৫০ বছর পেরিয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে নানা আন্দোলন গড়ে উঠেছে, শক্তিশালী হয়েছে। আগামীর বাংলাদেশে নারীর অবস্থান আরও সুদৃঢ় হতে হবে। এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রয়াসেই কাজ করে যাচ্ছে পিস ক্যাফে। আমরা এটিকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে দিতে চাই। আমরা শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে চাই, যাতে তারা সমাজের শান্তির দূত হয়ে ওঠে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ভিনসেন্ট চ্যাং বলেন, ক্লাসরুমে বসে শুধু নোট নিলে চলবে না। চিন্তাচেতনার প্রসার হতে হবে সীমানা ছাড়িয়ে। পিস ক্যাফে এমন একটি উদ্যোগ, যা সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে কাজ করছে। নারীদের উন্নয়নের কথা বলছে। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উৎসাহ যোগাচ্ছে। দেশ ও বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এমন উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ইত্তেফাক/এসটিএম