ব্লু ইকোনমি : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:০৬

ব্লু ইকোনমি—সময়ের অন্যতম আলোচিত একটি বিষয়। সমুদ্র-সম্পদনির্ভর অর্থনীতিই ব্লু ইকোনমি নামে পরিচিত। অন্যভাবে বললে, নীল (ব্লু) সমুদ্রকেন্দ্রিক যে অর্থনীতি, তাই সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি। বিশ্বব্যাংকের মতে, সুনীল অর্থনীতি বলতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নততর জীবিকার সংস্থান ও সামুদ্রিক প্রতিবেশের উন্নয়নকে বুঝায়। ১৯৯৪ সালে অধ্যাপক গুন্টার পাউলি ভবিষ্যতের অর্থনীতির রূপরেখা প্রণয়নের জন্য একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব মডেল হিসেবে ব্লু ইকোনমির ধারণা দেন।

উল্লেখ করার বিষয়, বিগত বছরগুলোতে পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে যতগুলো আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, প্রায় সবগুলোতেই ব্লু ইকোনমি ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। সংশ্লিষ্ট অন্য আলোচনা-সভাগুলোতেও ঘুরেফিরে আসে সুনীল অর্থনীতি। এর কারণও স্পষ্ট। ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে প্রায় ৯০০ কোটি। বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা মিটাতে পৃথিবীর দেশগুলো চেয়ে আছে সমুদ্রের দিকে। বর্তমানে সমগ্র বিশ্বের সঙ্গে ব্লু ইকোনমির ধারণা বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হচ্ছে।

এখন সবারই জানা, ব্লু ইকোনমির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটা দেশ। দেশের বিশাল সমুদ্রসীমা থেকে ব্যাপক পরিমাণ সম্পদ আহরণ করে দেশের অর্থনীতিকে অনেকখানি সমৃদ্ধ করতে পারি আমরা। ২০১৪ সালে আমরা মিয়ানমারের কাছ থেকে সমুদ্র জয় করেছি। এতে করে বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার আয়তন ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। সমুদ্রে অফুরন্ত সম্ভাবনার মধ্যে প্রধান উৎস মাছের বাইরেও রয়েছে জৈবপ্রযুক্তি বা বায়োটেকনোলজি, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজভাঙা শিল্প, সামুদ্রিক জলজ প্রাণীর চাষাবাদ, লবণ উৎপাদন, সামুদ্রিক নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, তেল-গ্যাস ও অন্যান্য সামুদ্রিক খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান, সমুদ্রবন্দর ও সমুদ্র পর্যটন।

মনে রাখা দরকার, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাগুলোর মধ্যে ১৪ নম্বর লক্ষ্যটি সমুদ্র এবং সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে গোটা সমুদ্রসীমা তথা ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের যথাযথ ব্যবহার করা গেলে ব্লু ইকোনমি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে—এই কথা বলাই বাহুল্য। তেল-গ্যাস উত্তোলন, মত্সসম্পদ আহরণ, বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও পর্যটন ক্ষেত্রগুলোর যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জিডিপি অর্জন সম্ভব। তাছাড়া আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চল ২০০ নটিক্যাল মাইলের সম্পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশের অর্থনীতিকে আরো সুদৃঢ় করা সম্ভব। সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল ‘কু্ল’ পাওয়া গেছে সমুদ্রের ৩০-৮০ মিটার গভীরে, যা উত্তোলন নিশ্চিত করতে পারলে দেশে সিমেন্ট শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে বলছেন বিশেষজ্ঞমহল। ব্লু ইকোনমির মূল উদ্দেশ্যই হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করা, দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করা, সামাজিক পুঁজির সৃষ্টি করে আয় বাড়ানো ও পরিবেশ, সঞ্চয়-বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এই সুযোগটি লুফে নিতে পারে।

তবে এ কথাও সত্য, বাংলাদেশে ব্লু ইকোনমির ক্ষেত্রে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। দক্ষ জনবলের অভাব, সমুদ্র সম্পদের সঠিক তথ্যের অভাব, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাবের মতো সমস্যা নিয়ে কাজ করা না হলে ব্লু ইকোনমির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হব আমরা। এসব বিষয় মাথায় রেখে সঠিক ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। আশার কথা হলো, সরকার ব্লু ইকোনমির সর্বোচ্চ ব্যবহারে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ সম্পর্কিত জ্ঞানার্জন ও দক্ষতা বিকাশের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ চালু করা হয়েছে। মহেশখালীতে সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা ও ঢেউকে কাজে লাগিয়ে শক্তি উৎপাদনের জন্য চালু আছে বিশেষ প্রকল্প। শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে পতেঙ্গা ও সেন্টমার্টিনসহ কয়েকটি জায়গায় এমন সব প্রকল্প রয়েছে, যা আমাদের আশান্বিত করে। যদিও এ ধরনের প্রকল্প ও উদ্যোগ আরো প্রসারিত করা সময়ের দাবি। এমতাবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মাথায় রাখতে হবে, সমুদ্রসম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নানাবিধ সংকটের মোকাবিলা করা সহজতর হবে। অন্যান্য খাতের জন্যও ব্লু ইকোনমি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন