করোনা, নতুন স্বাভাবিকতার কাল পেরিয়ে পুরোনো ছন্দে ফিরেছে বইমেলা। সেই আনন্দ খেলা করছিল মৌলি আজাদের চোখে মুখে। মেলায় প্রথম দিন আসার খুশির আভা লেগেছিল নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা তিন বোনের হাসিতে। কখন খুলবে মেলার দ্বার—টিএসসির প্রবেশপথের সামনে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে অপেক্ষায় লেখক মৌলি আজাদ। মেলায় আসার জন্য তর সইছিল না যেন। মাথায় রঙিন ফুলের টায়রা দিয়ে বইমেলায় রং ছড়াল স্কুলপড়ুয়া তিন বোন। সে আনন্দের আলো ছড়িয়ে গিয়েছে পুরো বইমেলাতেই। প্রকাশক, লেখক, মেলায় আসা পাঠক—সবার অভিব্যক্তিতেই সেই আনন্দ ধরা পড়ল।
ফেব্রুয়ারির পয়লা তারিখে প্রথা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করলেন বইমেলার। তার উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দুয়ার খুলল অমর একুশে বইমেলার। আঁধার নামতেই আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল স্বাধীনতা স্তম্ভ। ভাষাশহিদদের স্মরণে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভের উজ্জ্বল আলো ভিন্ন দ্যোতনা ছড়িয়ে দিল বইমেলা প্রাঙ্গণে, মানুষের মনে। বাঙালির জীবনে আবারও ফিরে এলো নতুন বইয়ের গন্ধ জড়ানো মাদকতাময় মাস। শুরু হলো বাঙালির প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৩’।
স্বাধীনতা স্তম্ভের তিন পাশ জুড়ে সাড়ে ১১ লাখ বর্গফুটের বিশাল এলাকা জুড়ে বইমেলার চৌহদ্দি। রঙে, আলোয় বর্ণিল হয়ে উঠেছে। বইমেলা এখনো গুছিয়ে ওঠেনি। অনেক স্টল প্যাভিলিয়নে এখনো নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। বেশির ভাগ স্টলেই রং করা, স্টলের কাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। বই সাজানো হয়নি অনেক স্টলেই। তার পরও বইমেলায় ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগছে। মেলায় মানুষের আনাগোনার কমতি ছিল না।
মৌলি আজাদ বললেন, মেলায় আসতে সব সময়ই ভালো লাগে। তবে, এবারের আনন্দটা আরো বেশি। মেলা তার ঐতিহ্য ধরে রেখে পয়লা ফেব্রুয়ারিতেই শুরু হলো। আর মেলার বিন্যাসটাও সুন্দর।
নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের ছাত্রী তাবিয়া, নাবিলা ও আয়েশা চাচা আলমগীর হাওলাদারের সঙ্গে এসেছেন মেলায়। অন্যপ্রকাশের স্টল থেকে কিনলেন হুমায়ূন আহমেদের বই। তাবিয়া বললেন, প্রথম দিনেই আসব—আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম আমরা। বই কিনব আর সেলফি তুলব।
অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম বললেন, বইমেলা যে আগের নিয়মে আসতে পেরেছে সেটাই বড় প্রাপ্তি। মেলা পাঠক লেখকের আনাগোনায় জমে উঠবে—প্রত্যাশা সেটাই।
মেলায় এসেছিলেন অধ্যাপক হারুণ-অর-রশিদ। বললেন, বাঙালি মাত্রেই বইমেলার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক। আমারও ভালো লাগছে। তবে, মেলায় স্টল নির্মাণের সরঞ্জাম জমে রয়েছে। এটা দেখতে ভালো লাগছে না। মেলা কর্তৃপক্ষের দ্রুতই এসব পরিষ্কার করার তাগিদ দিলেন তিনি। এবার মেলায় তার বেশকিছু বই এসেছে অন্যপ্রকাশ থেকে, জানালেন তা।
এদিকে, মেলায় বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টলে কথা বলে জানা গেল, বই প্রকাশনায় এবার প্রকাশকদের প্রস্তুতিও ভালো। প্রথম দিনেই অনেক জনপ্রিয় লেখকের বই চলে আসতে দেখা গেল মেলায়। আগামী প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী ওসমান গণি বললেন, বইমেলা এবার জমে উঠবে। মেলার বিন্যাস খুব ভালো হয়েছে। তবে, পাঠকদের আকৃষ্ট করতে প্রকাশনায় বৈচিত্র্য আনতে হবে। তিনি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ এবং বাংলা সাহিত্যের ভালো লেখকদের বই ইংরেজিতে অনুবাদ করার প্রতি জোর দেন।
বইমেলায় প্রবেশে ভোগান্তি :প্রথম দিন বইমেলায় প্রবেশে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে বেশ। রমান কালীমন্দিরের গেট পুরোটা বন্ধ রেখে শুধু একজন চলাচলের ছোটো দরজা খুলে রেখেছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ফলে শত শত মানুষের জটলা বেধে যায়। অন্যদিকে, মেলা থেকে বের হওয়ার পরমাণু শক্তি কমিশনের উলটো দিকের গেটও বন্ধ করে রাখা ছিল। একজন মানুষ কোনোমতে বের হতে দেখা যায়। কেন এমন অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে—এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
মেলায় নতুন বই :আগামী প্রকাশনী মেলায় এনেছে মৌলি আজাদের লেখা গল্পগ্রন্থ ‘ইগলের চোখ’, অন্যপ্রকাশ এনেছে সাদাত হোসাইনের ‘শঙ্খচূড়’, কথাপ্রকাশ এনেছে আফসান চৌধুরীর ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ধারাবাহিকতার ইতিহাস ১৯০৫-১৯৭১’, পাঠক সমাবেশ এনেছে স্বকৃত নোমানের উপন্যাস ‘রাজনটী’ এবং পনেরোটি গল্প নিয়ে ‘কয়েকজন দেহ’, ঐতিহ্য এনেছে মঈন আহমেদের ‘যাত্রাতিহাস: বাংলার যাত্রাশিল্পের আদিগন্ত’, গোলাম কিবরিয়া ভূইয়া অনূদিত ‘ঢাকা ডায়েরি :সতেরো আঠারো শতকের বাংলা’।
