বানানো নয় বাস্তব ঘটনা নিয়ে লেখা ‘কেবলই রাত হয়ে যায়’

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৫:৩২

‘ব্যাকস্টেজে সিগারেট খাওয়া নিষেধ। একটি মেয়ে এসবের তোয়াক্কা না করে একের পর সিগারেট খেয়েই যাচ্ছে। তার গায়ে তোয়ালের মতো কিছু চাপানো। 
মেয়েটার বয়স এত অল্প। তার সিরিয়াল শেষের দিকে। মেয়েটা নিজে থেকেই শ্যামলের দিকে এগিয়ে এলো। হাই, তুমি নতুন জয়েন করেছো?
- হ্যাঁ।
- কী নাম তোমার?
- শ্যামল।
মেয়েটা অনেক কষ্টে নামটা উচ্চারণ করলো। আশ্চর্যজনকভাবে উচ্চারণ হলো নির্ভুল। বিদেশির পক্ষে এই নাম উচ্চারণ করা সহজ নয়। শ্যামলের মনটা ভালো হয়ে গেলো।
- পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম শ্যামল। আশা করি তোমার নাম ঠিকভাবে উচ্চারণ করেছি। আমি লুসি উইলবার। আমাকে লুসি বলে ডাকতে পারো। 
- আচ্ছা।
- তুমি কি লজ্জা পাচ্ছো?
- না লজ্জা পাবো কেন?
- কিন্তু তোমার মুখ কিন্তু অন্য কথা বলছে। ও মাই গড। তোমার গাল তো লাল হয়ে যাচ্ছে।
শ্যামল কী বলবে বুঝতে পারছে না।
কথা বলতে বলতে মেয়েটি তার গা থেকে কাপড় খুলে শ্যামলের হাতে দিলো। তার ডাক এসেছে। ফিসফিস করে মেয়েটি শ্যামলকে বললো, উইশ মি গুড লাক।
তারপর দৌড়ে চলে গেলো স্টেজে।’
সুলেখক আশীফ এন্তাজ রবির উপন্যাস ‘কেবলই রাত হয়ে যায়’ এর কয়েকটি লাইন এটি। স্বভাবতই রবি পাঠক আকৃষ্ট করার ক্ষমতা রাখেন, যেটি এর আগের উপন্যাসগুলোতে তিনি প্রমাণ দিয়েছেন। এবার তাম্রলিপি থেকে প্রকাশিত উপন্যাসটিও তার ব্যতিক্রম নয়। এমন উপন্যাস লেখার ভাবনা কীভাবে এলো জানতে চেয়েছিলাম যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক আশীফ এন্তাজ রবির কাছে?  

‘আমি যেহেতু ঢাকা-আমেরিকা নিয়ে বাস করি তাই প্রকাশকদের একটা দাবি থাকে এখানকার জীবনযাত্রা নিয়ে একটা উপন্যাস লিখি। কিন্তু আমি কখনো মনে করি না যে আমেরিকার জীবন যাপন নিয়ে আমার উপন্যাস লেখা দরকার। কারণ এদেশের জীবনযাপন আমাকে কখনো আকৃষ্ট করে না। কিন্তু আকৃষ্ট না করলেও এদেশের মানুষদেরতো আমি দেখেছি। তাদের সঙ্গে মিশেছি। সেই জায়গা থেকে উপন্যাসটা লেখা। এটা একটা দীর্ঘ উপন্যাস। এই উপন্যাসে রয়েছে একাধিক চরিত্র। এর কোনোটাই বানানো নয়। সব চরিত্রের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। যেমন প্রধান চরিত্র মুহিব। সে বহুদিন থেকে আমেরিকায় থাকে। ছাত্রজীবনে এসেছিল। পরে এখানকার নাগরিক হয়। তারপরও যা হয় এখানে থাকলেও সে বিয়ে করেছিল বাংলাদেশে। কিন্তু তার বিয়েটা টিকে নাই। সংসার শুরুর আগেই তার বিয়ে ভেঙে যায়। এই যে বিয়ে ভেঙে যায় সে কিন্তু আর বিয়ে করেনি। কেন ভেঙে যায় তার কারণটা উপন্যাসে দেওয়া আছে। আবার কেন যে আবার বিয়ে করেনি তারও একটা রহস্য আছে।’ উপন্যাসের চরিত্রগুলো তাহলে আপনার আশেপাশেই রয়েছে? 

‘খুব সতর্ক ছিলাম যেন পরিচিত কোনো নির্দিষ্ট চরিত্রের সঙ্গে যাতে না মেলে। মুহিব, শ্যামল, লোভা, ফরিদ উপন্যাসের এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে আমার আশেপাশের চরিত্রের সঙ্গে সরাসরি মিল নেই। যেমন মুহিবের কথা যদি বলি, তার চরিত্র অনেকগুলো চরিত্রের সমন্বয়। আমেরিকায় বাংলাদেশি চরিত্রের মিলিত উপাদান যেন। একজন সাহিত্যরসিক এই গল্প পড়ে বলেছেন, ‘রবি ভাই আপনার নিজের চরিত্র আপনি অনেকগুলো চরিত্রের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন।’ কথাটা কি ঠিক? ‘আমি বললাম কথাটা ঠিক।’ 

‘আমার আনন্দ, কষ্ট, হাসি, বেদনা, জীবন সংগ্রাম এই চরিত্রগুলোর মধ্যে ভাগ করে দিয়েছি। ফলে প্রতিটি চরিত্র খুব কালারফুল ও খুব বাস্তবভিত্তিক হয়েছে। আমি যখন এই উপন্যাসটা লিখতে শুরু করি তখন আমেরিকার বাঙালি পাড়ায় অনেকে মনে করতেছিল না জানি রবি কার গোমর ফাঁস করে দেয়।’ 

গল্পের চরিত্র নিয়ে কথা বলেন রবি। 

‘মুহিবের এক বন্ধু আছে শ্যামল। শ্যামলের বউ ও তাদের এক বাচ্চা আছে। বাচ্চাটা তার বউ দেখে। শ্যামল ছিলো আড্ডাবাজ ছেলে। কিন্তু আমেরিকায়তো সেই পরিবেশ নেই। সেই কারণে সে খুব আজগুবি কাজ করে। যেমন সে তার বাসার সামনে বাংলাদেশি পতাকা টাঙিয়ে রাখে এবং এটা নিয়ে পাড়ায় অনেক কৌতুহল সৃষ্টি হয়। কারণ এখানে বাংলাদেশ নামটা যতোটা পরিচিত পতাকাটা ততোটা পরিচিত নয়। আরেকটা কাণ্ড সে করে। যেমন বাসায় শুটকি আর গরুর বট রান্না করে। এই গন্ধে আশেপাশে টেকা দায়। তার বিচিত্র স্বভাবের কারণে সে বিচিত্র চাকরিও করে। যেমন সে একটা বারে কাজ করে, যেখানে মেয়েরা নগ্ন হয়ে নাচে। কিন্তু ওই বারে কাজ করার কারণে তার স্ত্রীর সঙ্গে সমস্যা তৈরি হয়। এমন লোবার গল্প, আনন্দ বেদনা এই উপন্যাসের বড় উপজীব্য। আমেরিকায় এসে বৈধ কাগজপত্র না পাওয়া দম্পতির গল্প। কারণ এখানে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কিছুই করা যায় না। কিছু আমেরিকান চরিত্রও আছে। সবকিছু মিলিয়ে কেবলই রাত হয়ে যায় বলতে পারি একটা বিষাদের গল্প। কিন্তু এই সংগ্রাম ও বিষাদের মধ্যে সুক্ষ্ণ একটা আনন্দ আছে। আমার ধারণা সেটা উপন্যাসে ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারছি। কারণ আমি মনে করি জীবনের সব সুখগুলো রয়েছে ঠিক দুঃখের মাঝখানে।’

‘প্র প্রকাশনা’ থেকে আপনার কিশোর ফ্যান্টাসি উপন্যাসও এসেছে। এবারই প্রথম কিশোর উপন্যাস লিখলেন? ‘আমাকে একদিন সুমন্ত আসলাম (লেখক ও সাংবাদিক) নির্দেশ দিলেন একটা উপন্যাস লিখতে হবে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। ছোট উপন্যাস দেড়শ পৃষ্ঠার মতো। কিন্তু সুমন্ত যেটা শুরুতে বলে নাই সেটা হলো উপন্যাসটি হবে কিশোর উপন্যাস। আমি বিপদে পড়ে গেলাম। কারণ আমি কখনো কিশোর কিছুই লিখি নাই। এমনকি কিশোর সাহিত্যের বিষয়টির সঙ্গেও একমত না। সাহিত্যতো সাহিত্যই। এছাড়া কিশোর সাহিত্য বলতে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এভাবে সৃষ্টি হয় ‘উওজা’।’ 

‘উওজা একটা ফ্যান্টাসি গল্প। কেমন ফ্যান্টাসি। চারদিনের বৃষ্টিতে ঢাকা শহর তলিয়ে গেছে। যেটা হয় আর কি? মিরপুরে শান্ত নামে একটা ছেলে থাকে দোতলায়। একতলা ডুবে গেছে। তো একদিন সে দেখে একটা কচ্ছপ ভেসে আসছে। কচ্ছপটা মজার। কারণ শরীরটা কচ্ছপের কিন্তু মাথাটা একটা কিশোরের। এ নিয়ে গল্প শুরু হয়। শান্তর সঙ্গে থাকে তার জ্ঞানী লাবিব মামা। তারা এই কচ্ছপটাকে লুকিয়ে লুকিয়ে পালতে শুরু করে। কিন্তু দিনে দিনে কচ্ছপটা বড় হতে থাকে আর সবাই জেনে যায়। পুলিশ, প্রশাসন, এলাকার মানুষ এর পেছনে লাগে। কিন্তু শান্ত ও তার মামা এই কচ্ছপটা নিয়ে পালিয়ে যায়। এটা নিয়ে ফেসবুক, ইউটিউব থেকে শুরু করে নানা জায়গায় টকশো হয়। এখানে কচ্ছপটা আসলে প্রতীকী। কারণ প্রাণিজগতে কচ্ছপের শক্ত মেরুদণ্ড রয়েছে। কচ্ছপের কাছ থেকে শিখতে পারি কীভাবে মেরুদণ্ড শক্ত রাখতে হয়। পাশাপাশি কীভাবে ধীরস্থির থাকতে পারি। এই কচ্ছপটা কেন উওজা বলে এর উত্তর রয়েছে এই উপন্যাসে।’  

আশীফ এন্তাজ রবি ঐতিহাসিক ঘটনা নির্ভর পরপর দুটো উপন্যাস লিখলেন। যেমন ‘পূর্ব পশ্চিম’ বইটা হচ্ছে ১৯৬৩ থেকে ১৬৬৯। এখানের চরিত্রগুলো খুবই বিখ্যাত। যেমন বঙ্গবন্ধু, আহমদ ছফা, হেলাল হাফিজ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন আছেন। রবির মতে, ‘এদের নিয়ে যে কাহিনী লিখেছি সেগুলোর বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। এরপরের বছর যেটা লিখলাম সেটা কবি নজরুলের জীবনীভিত্তিক উপন্যাস ‘আমারে দেব না ভুলিতে’। এটি কবির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। পুরো উপন্যাসে কল্পনার পাশাপাশি ঐতিহাসিকভাবে সত্য রয়েছে। দুটো উপন্যাসে কখনো কখনো ফিকশন গিয়ে মিশেছে ফ্যাক্ট এর সঙ্গে কখনো ফ্যাক্ট মিশেছে ফিকশনের সঙ্গে।’

ইত্তেফাক/এএএম