‘লজিক লাবু লিখতে গিয়েই লিখে ফেললাম প্রতি মঙ্গলবার আমরা বই ছাড়া স্কুলে যাই’

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৫:৪৪

সপ্তাহের একটি দিন বিদ্যাসাগর হাইস্কুলকে চেনাই যায় না। এদিন সবাই স্কুলে আসে বই ছাড়া। পুরো একটি দিন স্কুল হয় বইপত্র ছাড়া। ভাবা যায়! মঙ্গলবার হচ্ছে স্কুলের সেই বিশেষ দিন- ‘নো ব্যাগ ডে’। অর্থাৎ নো পড়াশোনা। তাহলে সেদিন স্কুলে কী হয়? সে এক মজার গল্প!

অভিনব এই উদ্যোগের পরিকল্পনা এসএমএস স্যারের। তিনি বিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও স্কুলের সৃজনশীল দিকটাও দেখভাল করেন। আর এ যাত্রায় তার সঙ্গী হয় ক্লাস এইটের ‘ফুল পরিষদ’। টগর, বকুল, শিমুল আর চামেলি- চার বন্ধু। ফুলের নামে বলে যারা ফুল পরিষদ নামে পরিচিত।

প্রধান শিক্ষক কিতাব উদ্দিন স্যার চাইছিলেন পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুলে সৃজনশীল চর্চাকে আরেকটু গতিশীল করতে। তার স্বপ্ন বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন বিদ্যাসাগর হাইস্কুলের সাফল্যকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।

হেডস্যারের স্বপ্ন বাস্তবায়নে মাঠে নামেন এসএমএস স্যার। কিন্তু তার পরিকল্পনা শুনে অনেকেই আকাশ থেকে পরে। স্কুলে খোলা থাকবে অথচ ক্লাস হবে না! এ কীভাবে সম্ভব!

হেডস্যারের মনেও কিছুটা শংকা ছিল। তবুও তিনি এসএমএস স্যারকে একটা সুযোগ দেন। পরীক্ষামূলকভাবে স্কুলে চালু হয় ‘নো ব্যাগ ডে’।

এক সুযোগেই বাজিমাত করেন এসএসএম স্যার। অভিনব এবং মজার সব কর্মকাণ্ড দিয়ে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। আর তাতে সৃজনশীল ক্ষেত্রে যেমন সাফল্য আসে তেমনি সাফল্য আসে পড়াশোনায়ও। আবার স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরাও আছে তুমুল আনন্দে! অল্প সময়ের মধ্যেই বিদ্যাসাগর হাই স্কুলের মাইন্ডব্লোয়িং মঙ্গলবারের খবর ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। কিন্তু কীভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন এসএমএস স্যার!

এসব নিয়েই মূলত পলাশ মাহবুবের ‘প্রতি মঙ্গলবার আমরা বই ছাড়া স্কুলে যাই’ এর গল্প। বইটি প্রকাশ করেছে প্র প্রকাশন। পা্ওয়া যাবে বইমেলার প্রথমা প্রকাশন এ। প্যাভেলিয়ন নম্বর ৬।

তবে কিশোর সাহিত্যে পলাশ মাহবুবের গল্পটা আরো দীর্ঘ। অন্তত ‘টো টো কোম্পানি’ বা ‘লজিক লাবু’ সিরিজের কথাতো বলতেই হয়।

কীভাবে লেখা হলো এবারের বইটি?

‘‘আমার মূলত লজিক লাবু নামে একটি বই রয়েছে। যেটির ছয়টি পর্ব ইতোমধ্যে প্রকাশ হয়েছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে। মাথায় ছিল এই লজিক লাবু সিরিজের সপ্তম উপন্যাসটি কী নিয়ে লেখা যায়? নানা বিষয় মাথায় ঘুরছিল। আবার পছন্দ হচ্ছিল না। এর চেয়ে ভালো কিছু চাইছিলাম। এসব ভাবতে ভাবতে ‘প্রতি মঙ্গলবার আমরা বই ছাড়া স্কুলে যাই’ এর গল্প মাথায় আসে। প্রথমে ভাবছিলাম এটি লজিক লাবু হিসেবে লিখব। পরে আমি লিখতে গিয়ে দেখলাম এটি আসলে লজিক লাবু সিরিজের সাথে সেভাবে যাচ্ছে না। কারণ লজিক লাবু সিরিজের যে ঢঙ সেটির সাথে এটি যায় না। কেন? কারণ লজিক লাবু লজিক দিয়েই সবকিছু করে কিন্তু এই বইয়ে আমরা যে স্কুল ব্যবস্থা দেখতে চাই একজন লেখকের জায়গা থেকে সেটি বলেছি। পরে ভাবলাম এটি আলাদা উপন্যাস হোক। নামটিও প্রথম দিকে আমার মাথায় ছিল না। মাঝামাঝি পর্যায়ে মাথায় এসেছে।’’

তার মানে এবার আপনার লজিক লাবুর পাঠকরা বঞ্চিত হলো?

‘আসলে ইচ্ছে ছিল। কিন্তু হলো না। কারণ আমাদেরতো শুধু লেখালেখি করলে হয় না। জীবিকার তাগিদে অন্যকিছুও করতে হয়। এবার একটু ব্যস্ততা বেশি ছিল। যে কারণে একটির বেশি হয়ে উঠেনি। এটা ঠিক লজিক লাবুর পাঠক ও প্রকাশকের কাছে তোপের মুখে আছি। আবার আমি তাড়াহুড়ো করে লিখতেও চাইনি। কারণে লজিক লাবুর যে পাঠক প্রিয়তা রয়েছে সেটি যাতে নষ্ট না হয়, গল্প যাতে ঝুলে না যায় সেদিকটা মাথায় রাখতে হয়েছে।’

বইয়ের ধারণা কি নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা থেকে নেওয়া?

‘‘ঠিক নির্দিষ্ট নয়। তবে বইয়ের নামের মাঝেই বইয়ের মূল কথা লেখা আছে। যে স্কুলটার কথা বলেছি সেখানে একদিন ছাত্র-ছাত্রীরা আসে বই ছাড়া মানে স্কুলের ব্যাগ ছাড়া। সেটি ‘নো ব্যাগ ডে’। আগেই বলেছি স্কুলের শিক্ষার্থীরা যাতে বইয়ে ভারাক্রান্ত না হয় সেটি সবসময় চেয়েছি। আমরা অনেক সময় দেখি শিশুর ওজনের চেয়ে ব্যাগের ওজন বেশি। শিক্ষার পাশপাশি আরো যে সৃজনশীলতা সেটির বিকাশ হওয়া দরকার। এই গল্পে ব্যাগ ছাড়া যারা স্কুলে আসে তারা ওইদিন কবিতা আবৃত্তি করে, গান করে, বাগান করে, ছবি আঁকে, খেলাধুলো করে এ ধরনের যতো সৃজনশীল কাজ আছে তারা করে।’’

এবার যদি একটু জানতে চাই লজিক লাবু গল্পটা কোথা থেকে পেলেন?

‘‘লজিক লাবুর আগে আসলে আমার টো টো কোম্পানি সিরিজের সাতটি উপন্যাস প্রকাশ হয়েছে। ওটা ছোট কাকু ও তার ভাতিজা মিলে নানা মজার কাহিনী করতো। ওই সিরিজ লেখার সময়ই আমি ভেবেছিলাম নতুন কিছু করা যায় কি না? তখন পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স-এর প্রকাশক কামরুল হাসান শায়ক ভাই একটা নতুন সিরিজ লেখার উৎসাহ দেন। তখনও নানা চরিত্র মাথায় ঘুরতো এবং একটা পর্যায়ে লজিক লাবুর বিষয়টি মাথায় আসে। লেখার ক্ষেত্রে হয়তো প্রভাব ফেলে কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো বিষয়কে ভেবে আমি লিখি না। কিন্তু আমার আগে একটা বই ছিল ‘ফটোকপি ফখরুল’ যেটি ঐতিহ্য থেকে প্রকাশ হয়েছিল। সেই বইয়ের আটটি গল্প আমার কোনো না কোনো বন্ধুকে নিয়ে লেখা হয়েছিল এবং ‘ফটোকপি ফখরুল’ এর ফখরুলও আমার বন্ধু। এটা ঠিক আমার কিশোর উপন্যাসের সবগুলোর বিষয়বস্তু স্কুলকেন্দ্রিক। তাই যখন চরিত্রগুলো আসে তখন স্কুলের শিক্ষক, বন্ধু বা শোনা কোনো চরিত্রতো আসেই।’’

পলাশ মাহবুব লেখালেখি করছেন দুই দশকের বেশি সময় ধরে। ছড়া দিয়ে শুরু। এরপর গল্প; ছোট-বড় সবার জন্য। উপন্যাস লেখার শুরু তার কিছু পর থেকে। টেলিভিশনের জন্য নাটকও লিখছেন অনেকদিন ধরে। তার লেখা অধিকাংশ নাটক আলোচিত ও দর্শকপ্রিয়। গল্প বলায় পলাশ মাহবুবের আছে নিজস্ব কথন ভঙ্গি।

লেখালেখির জন্য পেয়েছেন অগ্রণী ব্যাংক-বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ইউনিসেফ মীনা অ্যাওয়ার্ড, পশ্চিমবঙ্গের অন্নদাশঙ্কর রায় সাহিত্য পুরস্কারসহ বেশ কিছু পুরস্কার। পলাশ মাহবুব শিশুদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সিসেমি ওয়ার্কশপ বাংলাদেশ (সিসিমপুর) এর গণমাধ্যম ও জন সম্পর্ক উপদেষ্টা। পাশাপাশি তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল অপরাজেয় বাংলা’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা।

ইত্তেফাক/কেকে