আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশের লেখক লিজি রহমান। আমেরিকার মূলধারার রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত লেখেন দেশ বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকায়। আমেরিকার রাজনীতি ও মানুষের যাপিত জীবনের গল্প নিয়ে তার লেখা অনেক বই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অমর একুশে বইমেলা ২০২৩ এ প্রকাশিত হয়েছে লিজি রহমানের নতুন বই ‘আমেরিকায় বাঙালির চাষবাস’।
এই ব্যতিক্রমী বইটি সম্পর্কে জানতে চাই?
‘এই বইটার নাম শুনলেই বোঝা যায় বিষয়বস্তু। বাঙালিরা আমেরিকায় কীভাবে চাষাবাদ করছে এটা নিয়েই বই। তারা আমেরিকায় কীভাবে চাষাবাদ করছে। কিন্তু ওই বিষয়টাকে আমি একটু অন্যভাবে লিখেছি। রান্নার বইতে যেমন হয় তিনপট চাল বসান, দুইপট ডাল দেন এমন নয়। এমন করে রান্নার বিষয়টা দেখানো হয়। কিন্তু এখানে বিষয়টা তা নয়। আমারটা চাষবাসের বই কিন্তু সেটা বলা হয়েছে খুব রসিয়ে রসিয়ে একটু হিউমার দিয়ে এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমার ছেলেবেলার স্মৃতি কাহিনী, আছে যুক্তরাষ্ট্রের স্মৃতি কাহিনী এবং বর্তমানে পৃথিবীতে কী হচ্ছে এমন সব ঘটনা।
বাঙালিরা স্বভাবতই বিদেশে গিয়ে স্মৃতিকাতর থাকেন। বাংলার খাবারগুলোও যেন তারা পেতে চান বিদেশের মাটিতে। এই যে মনে করেন বাংলাদেশে এখন গরম কিন্তু আমেরিকায় বেশিরভাগ সময় বরফ পড়ে। ওখানে ঠাণ্ডাটা পড়তে শুরু করে নভেম্বর থেকে কিন্তু ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই তিনটা মাস ভয়াবহ অবস্থা। বরফ পড়বে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। এখন ওই ঠাণ্ডা, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে আমরা কীভাবে চাষ করি সেখানে এসব বিষয় নিয়ে বলা হয়েছে। আরেকটা বিষয় আছে, এখানে যেমন কোনো একটা বিচি লাগিয়ে দিলেন বছরের পর বছর ফুল ফুটছে, ফল দিচ্ছে কিন্তু ওখানে প্রতি বছর চাষ করতে হয়। কারণ ঠাণ্ডায় গাছ মরে যায়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ গাছই চিরজীবী আর ওখানে সব গাছ ক্ষণজীবী।’
আপনি আমাকে ছবিতে আপনার ঘরের এবং আশেপাশের বেশ কিছু বাগানের ছবি দেখালেন যেগুলো আপনি নিজে করেছেন। তার মানে বাগানটা আপনার ভালোলাগার জায়গা। তেমনি লেখালেখিও কি?
‘হ্যাঁ একদম ঠিক ধরেছেন। বাগানের পাশাপাশি আমার লেখালেখির নেশাটাও ছোটবেলা থেকেই। সেই ক্লাস এইটে পড়া অবস্থায় আমার লেখা ছাপা হলো দৈনিক সংবাদে। খেলাঘরে গেলাম। তেমনি ছোটবেলায় বাগান করতে গিয়ে ফুলগাছ চুরি করতাম সেটিও এই বইয়ে আছে।’
হঠাৎ বাগানের বিষয় নিয়ে কেন লিখলেন?
‘এই বিষয় নিয়ে লেখার আমার ইচ্ছে ছিল না। গত বছর আমার একটা বই প্রকাশ হয়েছে শোক ভুলতে পথে। ৩৩ বছর ধরে নিউইয়র্কে থাকি। সেখানে সাপ্তাহিক ‘বাঙালি’ পত্রিকায় নিয়মিত লিখি। করোনার সময়টাতে আমি মূলত বাগানের দিকে মনযোগ দেই বেশি। চাকরি করতাম সেখানকার সার্টিফাইড টিচার আমি। কিন্তু করোনার পর আর চাকরিতে ফিরে যাইনি। তখন সারাদিন বাগানে থাকতাম আর সন্ধ্যার পর লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। একদিন আমার সম্পাদকের সাথে কথা বলছিলাম আমার বাগান নিয়ে। কিন্তু উনি শুনে আগ্রহ প্রকাশ করলেন এবং বললেন বাগান নিয়ে লিখতে। এরপর শুরু করলাম যখন যেটা ঘটছে সেটা নিয়ে লেখা।’
এর আগেও বেশ কয়েকটি বই আপনি লিখেছেন?
‘আমি আসলে লেখালেখি করেছি প্রচুর। কিন্তু বই প্রকাশ সে অর্থে কম। আমার একেকটা বই একেক ধরনের। একটা বই আছে শুরুর দিকে গল্প থেকে অনেক গল্প রয়েছে। যেটার নাম রংধনুর দেশ, মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে কিশোরীর চোখে মুক্তিযুদ্ধ। কারণ যখন মুক্তিযুদ্ধ হয় তখন আমি ক্লাস নাইনে। সেই স্মৃতির কথা আমি লিখেছি। বিভিন্ন কলাম নিয়ে, ওহ! আমেরিকা, পলিটিক্স নিয়ে রয়েছে আমেরিকার ক্রান্তিকাল ও ডোনাল্ড ট্রাম্প, আমার এক্টিভিজম নিয়ে লেখা শোক ভুলতে পথে। আমার সম্পাদিত অন্য বইগুলো হলো স্মৃতির বাতায়নে চাঁদের হাট, উতল মেঘের কাল, থ্রু দ্য রাইমস।’
লেখালেখিটা তাহলে আপনার মজ্জাগত?
‘ছেলেবেলা থেকেই আসলে লেখালেখিটা মনের মধ্যে গেঁথে আছে। চাঁদের হাটে যোগ দিলাম। স্বাধীনতার পরপরই যেমন আফজাল হোসেন, ফরিদুর রেজা সাগর, ইমদাদুল হক মিলন, সাইফুল আলম আমরা সবাই চাঁদের হাটের। তখন বাংলা একাডেমিতে যেতাম। ছোট ছোট ম্যাগাজিনে লেখা থাকতো আমার। সেই থেকে বইমেলাটা আমার প্রাণের মধ্যে গেঁথে আছে। আমার এবারের বইটা যারা পড়েছে তারাই বলেছেন অনেকে উপকৃত হয়েছেন। বিশেষ করে যারা শীতের দেশে রয়েছেন। এখানে যেমন একটা বাগান করতে হলে কতো জন সহযোগিতা করেন কিন্তু ওখানে সবই নিজেকে করতে হয়। আমার ঘরটার চারপাশে কিন্তু নানা বাগান। এই বইয়ে একটা অধ্যায় রয়েছে শরীর চর্চায় বাগান। বাগান করলে শরীর যেমন ভালো থাকে তেমনি মনও ভালো থাকে।’
প্রসঙ্গত, লিজি রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন। নিউ ইয়র্কের কুইন্স কলেজ থেকে এডুকেশনে মাস্টার্স করেন। এরপর নিউ ইয়র্কের পাবলিক স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ২০০৮ সালে বড় ছেলে আসিফ রহমানকে এক সড়ক দুর্ঘটনায় হারানোর পর নিউ ইয়র্কে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। তার ছেলের নামে বাইক লেন করা হয়েছে।

