মৃত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন ‘খেদু মিয়া’

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৫:০৫

চিকিৎসক অসীম হিমেল পেশার পাশাপাশি লিখেনও চমৎকার। তার ‘খেদু মিয়া’ নিয়ে লেখা উপন্যাস ইতোমধ্যে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। এবার অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে খেদু মিয়া সিরিজের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ধূম্রজালে খেদু মিয়া’। এসব নিয়েই বইমেলার মাঠে কথা হয় অসীম হিমেলের সঙ্গে।

লিখতে লিখতে ‘খেদু মিয়া’ লিখে ফেললেন?

‘আমিতো পেশায় ডাক্তার। করোনার সময় আমাদের বিশাল এক দায়িত্ববোধ এসে ভর করেছিল। সেই সময় মানুষ অনেকটা প্যানিক হয়ে গিয়েছিল। ডিউটির পর তখন অনেকদিন আলাদা থাকতে হতো। আমার কাছে প্রতিনিয়ত আত্মীয় স্বজন বন্ধুরা ফোনে চিকিৎসা নিত। তাদের মধ্যে ভয় এই করোনায় মারা যাচ্ছি কি না! মৃত্যু সত্য। কিন্তু আমরা মানতে পারি না। স্বল্প সময়ে চেম্বারে তখন রোগী আসতো না। তখন মানুষের আতঙ্কটা কাছ থেকে দেখছি। মানুষ মারা যাচ্ছে তাকে কবর দেওয়ার কেউ নেই। কবর দিতে পারছে না। তখন চিন্তা করলাম মানুষকে কীভাবে অন্যদিকে পরিচালিত করা যায়। সেই সময় আমার একটা উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে ফেসবুকে দিতে শুরু করি ‘মেজো কুমার এক সন্নাসী রাজা’। এটা লিখতে লিখতে দেখলাম মানুষ বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং নতুন পর্বের জন্য অপেক্ষা করছে। মানুষ করোনার আতঙ্ক ভুলে থাকছে। চারদিকে কবর, মৃত মানুষ নিয়ে লেখা হচ্ছে। চিন্তা করতে করতে খেদু মিয়ার গল্পটা মাথায় আসে।’

খেদু মিয়া নামটা কীভাবে নির্বাচন করলেন?

‘এমন একটা নাম খুঁজছিলাম যেটা মানুষের মাঝে সহজে আকৃষ্ট করে। এ সময় মনে পড়লো ছেলেবেলায় গ্রামের বাড়িতে একটা লোক থাকতেন। তার দু-কূলে কেউ ছিল না। তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাকে ‘খেইদ্যা’ ‘ওই খেদু’ এমন নামে ডাকা হতো। ওই নামটা আমি নিলাম। পরে খেদুর সাথে মিয়া যোগ করলাম। এরপর গল্প লেখার পরিপ্রেক্ষিতে যা যা দরকার তা এলো।’

অটোগ্রাফ দিচ্ছেন অসীম হিমেল

‘খেদু মিয়া মূলত আধিভৌতিক একটা কাহিনী। ওটার মধ্যে কিছু বার্তা ছিল। ব্যক্তিকেন্দ্রিক সময়ে মানুষ কতো হিংস্র হতে পারে। ভাত চুরির অভাবে মানুষ মানুষকে মেরে ফেলতে পারে অথচ এর চেয়ে বড় বড় চুরিতেও কিছু হয় না। সেই অপরাধটা সামনে এনেই আমি উপন্যাসটা লিখতে শুরু করি।’

খেদু মিয়াকে নিয়ে প্রথম উপন্যাসের সাড়া পাওয়ার পরই কি আপনি দ্বিতীয় পর্ব লেখা শুরু করলেন?

‘খেদু মিয়াকে নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাসে আমি বেশ সাড়া পাই। কিছু পাঠক তৈরি হয়। পাঠকেরও আগ্রহ ছিল আবার আরো একটা কাহিনী মাথায় চলে আসে, সে কারণে নতুন করে লেখা শুরু করা। বাংলা ভাষায় ইউনিক কিছু চরিত্রের মতো এটাও আমার সৃষ্টি হিসেবে চালানো যায় কি না? দ্বিতীয় পর্বে আমি দেখাতে চেয়েছি চিকিৎসার জন্য আমরা ভারতে যাই কিন্তু বাংলাদেশেও যে চিকিৎসার জন্য ভালো জায়গা থাকতে পারে সেটাও এখানে দেখিয়েছি। তুলে ধরেছি মানসিক নির্যাতন মানুষকে কী করতে পারে। সমাজের কিছু অসঙ্গতি তুলে ধরেছি।’

চিকিৎসার পাশাপাশি লেখা এটা কি দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফল?

‘‘ক্লাস নাইনে থাকতেই স্কুল ম্যাগাজিনে আমার লেখা ছাপা হয়। তারপর কিছু ছাপা হয় দেয়াল পত্রিকায়। লিটল ম্যাগে। জাতীয় পত্রিকায়ও মাঝে মাঝে লেখা ছাপা হতো। ১৯৯৫ সালের দিকে আমার কিছু পুরনো ম্যাগাজিন খুঁজে পাই। ওইখানে দেখলাম কিছু ছোট গল্প, বড় গল্প, উপন্যাস এসব শুরু করা ছিল। পরে সেগুলো ধীরে ধীরে সম্পন্ন করতে থাকি। মাঝখানে অবশ্য নানা কারণে লেখা হয়নি, পড়ালেখাসহ নানা কিছু নিয়ে। ‘মধ্যরাতের অভিযান’ কিশোর উপন্যাস দিয়েই বই প্রকাশ শুরু।’’

‘চিকিৎসার পাশাপাশি লেখালেখির জন্য আলাদা সময় আমি দেই। যেমন কেউ খেলাধুলো করেন, রাজনীতি করে বিভিন্ন কিছু করেন। আমি সময় পেলেই লিখি। আমি যেটা মনে করি লেখালেখিটা প্রতিদিন চাইলেই হয় না। অনেক সময় লেখা এসে ভর করে তখন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখা যায় আবার অনেক সময় ইচ্ছে করলেও লেখা যায় না। তবে আমি যাই করি না কেনো পেশাগত জীবনে কখনো ফাঁকি দেই না।’

অসীম হিমেলের প্রকাশিত উপন্যাসগুলো হলো, ‘মধ্যরাতের অভিযান’, ‘জোছনায় নীল আকাশ’, ‘মেজো কুমার এক সন্নাসী রাজা’, ‘দূরবীনে ব্যাকবেঞ্চার’, ‘খেদু মিয়া’ ও ‘ধূম্রজালে খেদু মিয়া’। এবারে প্রকাশিত ‘ধুম্রজালে খেদু মিয়া’ নিয়ে বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা হয়েছে ‘ফরেনসিক মেডিসিনের অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর হয়েও, পূর্বপুরুষের করা পাপের কারণে, আদিভৌতিক এক রহস্যময় জীবন যাপন করতে হয় খেদু মিয়াকে। যার ফলশ্রুতিতে জড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন প্যারানরমাল ঘটিত সমস্যার সাথে। সায়েন্স, যুক্তি, আবেগ, প্রচলিত প্রথা সব মিলিয়ে সমাধান দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা করেন তিনি। ক্যারিয়ারের শুরুতেই এক অশুভ ছায়ায় ফেলোশিপ বাতিল হয়ে যায় ডা. মিতুর। জীবন এলোমেলো করে হানা দেয় ভয়ানক এক মানসিক রোগ। যাকে মেডিকেলের ভাষায় বলা হয় ডুয়েল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার। অপারেশান সাকসেসফুল হয়ে বাড়ি ফেরত যাওয়ার কিছুদিন পর অজ্ঞাত কারনে কয়েকজন রোগীর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে সার্জন ব্লকে পড়েন মিতুর প্রফেসর শামস ইবনে মোহাম্মদ ডা. আলম। অন্যদিকে, অপারেশনের অপেক্ষায় আছে বিরল রোগে আক্রান্ত চেন্নাইয়ের চিকিৎসকদের কাছ থেকে ফেরত আসা ছোট্ট মেয়ে দিবা। মিতু এবং তার প্রফেসরের সার্জন ব্লকের কারণ বিশ্লেষণ করে মুক্তির উপায় খুঁজতে গিয়ে খেদু মিয়া খুঁজে পান এক ভয়ঙ্কর পার্ভাটেড বা বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের। যে মানুষকে কঠিন শারীরিক আঘাত করে বিকৃত আনন্দ পায়। একই সূত্রে গাঁথা রহস্যের এক নরমাল ও প্যারানরমাল সমান্তরাল এক্টিভিটি নিয়েই কাহিনী ‘ধূম্রজালে খেদু মিয়া’।

ইত্তেফাক/এসকে