ছোটবেলায় যখন হামাগুড়ি শেষে সবেমাত্র হাঁটতে শিখেছি তখন মায়ের কাছ থেকে শিখেছি কোনটা ফুল, কোনটা ফল, কোনটা পশু, কোনটা পাখি। মানুষ তার মনের ভাব, মনের আবেগ, অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ও অন্যের সঙ্গে ভাবের আদানপ্রদানের জন্য ভাষা ব্যবহার করে। মানুষ প্রথম ভাষা শেখে তার মায়ের কাছ থেকে। একজন মা তার মুখের ছোট্ট ছোট্ট শব্দের মাধ্যমে নিজের সদ্যজাত সন্তানকে ভালোবাসার স্পর্শে ভাষা-কথা শিখিয়ে থাকেন। এভাবেই মূলত সন্তানের মুখে ভাষা প্রবহমান হয়ে থাকে। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই ভাষা এভাবে বহমান। পৃথিবীব্যাপী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর নিজ নিজ ভাষা রয়েছে। বাংলাদেশেও প্রায় ৪০-৫০ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। এদের কারো নিজস্ব বর্ণমালা আছে, কারো নেই। সামগ্রিক বিচারে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কোনো ভাষার অবস্থানই সন্তোষজনক পর্যায়ে নেই। শুধু বাংলাদেশে নয়, সমগ্র পৃথিবীর নৃ-গোষ্ঠীগুলোর ভাষারই এই দুরবস্থা! অধিকাংশ ভাষাবিজ্ঞানীর মতে—পৃথিবীতে প্রচলিত ৭ হাজার ভাষার মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে আরো কিছু ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যে সমস্ত ভাষা বিলুপ্তির পথে সেসব ভাষার অধিকাংশ যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
বাংলাদেশে যেসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা বিলুপ্তির পথে তাদের মধ্যে রয়েছে খাড়িয়া, কড়া, সৌরা, মুন্ডারি, কোল, মালতো, খুমি, পাংখোয়া, রেংমিটচা, চাক, খিয়াং, লুসাই ও পাত্র। এসব ভাষাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিলুপ্তপ্রায় ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারলে এসব ভাষা খুব শিগিগর পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাঙালি জাতির ১৯৫২ সালের আত্মত্যাগের দীর্ঘ ৪৭ বছর পর ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার ফলে হাজার হাজার মাতৃভাষার বেঁচে থাকার একটা সম্ভাবনা দেখা দেয়। পৃথিবীর যেসব দেশে তাদের নিজস্ব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা রয়েছে, সেগুলো তাদের দেশের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বেঁচে থাকবে—এমন একটা সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এদিক থেকে বিচার করলে, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষাগুলোও বাঁচিয়ে রাখার কথা! সত্যি বলতে, প্রতিটি দেশের সরকার এবং ইউনেসকোকে মাতৃভাষাগুলো রক্ষার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।
বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগে ভাষা সংরক্ষণ করা তেমন একটা কঠিন বিষয় নয়। দরকার শুধু সদিচ্ছা। বিশেষ করে যেসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষায় সাহিত্যিক নিদর্শন যেমন গদ্য, পদ্য, উপন্যাস আছে সেগুলো সংরক্ষণ করা অতি জরুরি। এসব সাহিত্যিক নিদর্শনের ওপর গবেষণা করলে নতুন কিছু আবিষ্কার করা সম্ভব হবে। মনে রাখতে হবে, কোনো একটি দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষাগুলো সেই দেশের সমাজ এবং সেই রাষ্ট্রের জ্ঞানচর্চা এবং বাচনিক ব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করে। আমরা সবাই অবগত আছি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণের জন্য ২০১৯ সালকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষাবর্ষ’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষাবর্ষে আদিবাসীদের ভাষা সংরক্ষণের জন্য যে পদক্ষেপগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো প্রতিটি রাষ্ট্রকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণের জন্য সরকারি-বেসরকারি উভয়কে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণ করা গেলে সত্যিকার অর্থে তা হবে একটি ভালো উদ্যোগ।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
