সরকারি হাসপাতালগুলো জনবান্ধব করা কি খুব কঠিন?

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০০:৪১

জীবন ধারণের জন্য খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা যেমন অপরিসীম, ঠিক তেমনি অসুস্থতায় মানুষের জীবন রক্ষার্থে চিকিৎসার বিকল্প নেই। জীবন রক্ষার্থে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবার দ্বারস্থ হয়। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে অভাবনীয়ভাবে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধও যুক্ত হয়েছে এই তালিকায়। আর্থিক দিকসহ আরো বিভিন্ন কিছু বিবেচনা করে দেশের মানুষের একটি বড় অংশ চিকিৎসা নিয়ে থাকেন সরকারি হাসপাতালগুলোতে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন হয়রানি ও অব্যবস্থাপনার শিকার হতে হয় তাদের, যা নিয়মিত প্রকাশিত হতে দেখা যায় গণমাধ্যমগুলোর খবরে।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করে চিকিৎসকের কাছ পর্যন্ত পৌঁছাতে অনেক সময় সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়ে। কী সাংঘাতিক বিষয়! অস্বীকার করার উপায় নেই, এর প্রধান কারণ রোগীদের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দকৃত সেবার অপর্যাপ্ততা। এছাড়া অসাধু দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য এবং হাসপাতাল জুড়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তো চিরচেনা দৃশ্য। অর্থাৎ হাসপাতালের সামগ্রিক পরিবেশের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। অধিকাংশ সময় দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকে না বা নষ্ট থাকে তথা সচল মেশিনগুলো প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। আবার নষ্ট যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য তেমন কোনো তৎপরতাও লক্ষ করা যায় না। এসবের কারণে রোগীদের পড়তে হয় তীব্র ভোগান্তিতে। এই ভোগান্তি এড়াতে কিছু মানুষ বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারমুখী হলে সেখানকার অতিরিক্ত খরচ সামলাতে তাদের যে কী পরিমাণে ‘নাস্তানাবুদ’ হতে হয়, কেবল ভুক্তভোগীই তা আন্দাজ করতে পারে।

জরিপমতে, বেসরকারি পর্যায়ে অতিরিক্ত ব্যয় সামলাতে বিপর্যস্ত হওয়ায় ১৬ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া থেকে বিরত থাকে। এতে মানুষ তার চিকিৎসাসেবার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনায়, বিশেষত সড়ক দুর্ঘটনার শিকার মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে ছুটে যায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ সময় আইনি জটিলতা থাকতে পারে এমন সম্ভাবনার কারণে কিংবা সময়মতো হাসপাতালে ডাক্তার না থাকায় বিপত্তির মুখে পড়তে হয়—এমন অভিযোগ নতুন নয়। এই যখন অবস্থা, তখন যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে সরকার, প্রশাসন, চিকিৎসক সর্বোপরি সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আরো সক্রিয় ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ কাম্য।

২০২২-২৩ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ। করোনা মহামারির পর বৈশ্বিক সংকটের পৃষ্ঠদেশে দাঁড়িয়েও বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। উল্লেখ করা দরকার, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের চিকিৎসা খাতে প্রশংসনীয় উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বিশেষ করে সামর্থ্যবান ব্যক্তিবর্গের চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা চোখে পড়ার মতো! এই তালিকায় রয়েছেন দেশের অনেক চিকিৎসকও। এভাবে বিদেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণ ডলার খরচ করে নিজের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা যায় বটে, কিন্তু দেশের ‘বৈদেশিক রিজার্ভের স্বাস্থ্য’ ঠিক রাখার প্রশ্নে এই সংস্কৃতি কি আদৌ গ্রহণযোগ্য?

তথ্য-উপাত্ত বলছে, ‘উন্নত চিকিৎসা’কে কারণ হিসেবে দেখিয়ে গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে তিন শতাধিক চিকিৎসক বিদেশে গিয়েছেন। যাদের মধ্যে বহু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও রয়েছেন। এর মধ্যে খোদ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগেরই তিন শতাধিক চিকিৎসক রয়েছেন। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব রোগের চিকিৎসা এখন দেশেই সম্ভব। তার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন, কারণ তারা দেশীয় চিকিৎসায় ভরসা রাখতে পারছেন না কিংবা দেশের চিকিৎসাসেবা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নন। এমনকি দেশের উন্নত চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগতও নন অনেকে। কী অদ্ভুত কথা!

এমতাবস্থায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারকে প্রয়োজনীয় ও যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে সবাই দেশের উন্নত চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে জানতে পারে এবং আস্থা রাখতে পারে। এতে করে ডলার সাশ্রয় হয়ে একদিকে দেশের অর্থনীতি যেমন উপকৃত হবে, তেমনি মানুষের ভোগান্তিও কমবে বহুলাংশে। এবং অবশ্যই সরকারি হাসপাতালগুলোতে সুযোগ-সুবিধা ও তদারকি বাড়ানোর বিষয়ে সরকারকে অবিলম্বে ভাবতে হবে। চিকিত্সকসহ এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাদের কাজের প্রতি একনিষ্ঠ হতে হবে। সরকারি চিকিৎসকদের বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখার ‘অতিপ্রবণতা’ থেকে বেরিয়ে আসাও অতি জরুরি। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত মোতাবেক দরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে সরকারি হাসপাতালে শতভাগ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও স্যালাইন নিশ্চিতের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এই কার্যক্রম ও উদ্যোগ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা গেলে তা দেশের দরিদ্র সেবাগ্রহীদের চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে। মোট কথা, দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতকে ‘জনবান্ধব’ হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে একনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন