অন্বেষা প্রকাশনের কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৫ সালে। ২০০৬ থেকে তারা বইমেলায় স্টল বরাদ্দ পান। সেই থেকে প্রতিটি বইমেলায় সুনামের সঙ্গে বই প্রকাশ করে আসছেন। বইয়ের ব্যবসাটা কিন্তু এখনো বাংলাবাজার কেন্দ্রিক। বিভিন্ন জায়গায় সুযোগ সুবিধা থাকলেও পাইকারি ব্যবসা সেখান থেকেই হয় বলে মনে করেন অন্বেষা প্রকাশনের কর্ণধার মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন। আজকের বইয়ের গল্পটা তাকে নিয়েই।
প্রকাশনায় কীভাবে এলেন?
প্রকাশনায় মূলত প্রথম এসেছি শখের বসে। যেহেতু আমার স্কুল ছিলো বাংলাবাজারের কাছে। সেখান থেকে বই কেনার জন্য বিভিন্ন সময়ে বাংলাবাজার আসতে হতো। তখন এমন অনেক লেখককে দেখতাম বাংলাবাজারের কোনো প্রকাশনাতে বসে কাজ করছেন। অথচ তাঁদের একটা অটোগ্রাফের জন্য ব্যাকুল থাকতাম। তাঁদের দেখে মুগ্ধ হতাম। তাঁরা হয়তো পাণ্ডুলিপি নিয়ে কথা বলছেন। তখন মনে হলো যাদের পাওয়ার জন্য এতো ব্যাকুলতা তারা এখানে এসে বসে থাকেন। ভাবতাম যদি আমি প্রকাশক হতে পারতাম তাঁদের সান্নিধ্য আমি পেতাম। এটা মনের মধ্যে ছিলো। এরপর শখের বসে আসা। কিন্তু এটাই যে পেশা হয়ে যাবে সেটা বুঝতে পারিনি।
শুরুতেই আপনি ভালো ভালো লেখকের বই পেয়েছেন? এটা কি টার্গেট ছিল?
এটা টার্গেট ছিলো না। যেমন হুমায়ূন আহমেদের বই পাবো সেটা আমি চিন্তাও করিনি। প্রকাশনার শুরুতে কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব আমাকে বেশ সহায়তা করেছেন। উনি না থাকলে হয়তো এভাবে এগুতে পারতাম না। ‘ঘুড্ডি’ নামে আমরা একটা শিশুতোষ সাহিত্য পত্রিকা বের করতাম। সেটার কারণে গিয়েছিলাম হুমায়ূন আহমেদের কাছে। পরবর্তীতে ২০০৮ সাল থেকে স্যারের বই আমরা পেতে শুরু করি। তাঁর প্রায় ২৭টা বই আমরা করেছি।
আমরা হুমায়ূন আহমেদের পাশাপাশি সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম থেকে শুরু করে বিভিন্ন গবেষণাধর্মী বইও বের করি। সেই সময়ে যারা ছিলেন অনেকের কাছে আমি গিয়েছি তাঁরা কেউই আমাকে বিমুখ করেননি এবং আমি বই করার সুযোগ পেয়েছি।
দীর্ঘ প্রকাশনার সময়ের কোন কোন ঘটনা আপনার মনে পড়ে?
আসলে একটা বই প্রকাশ করা মানেই আনন্দের বিষয়। হুমায়ূন আহমেদের বই যখন হাতে পেলাম ‘হিমুর মধ্য দুপুর’। প্রথমে গ্রল্পগ্রন্থ পেলাম, পরে হিমু নিয়ে পেলাম। এটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। স্যার হিমু অন্য কোথাও সহজে দেন না। কিন্তু আমাকে দিলেন এই আনন্দ কোথায় রাখবো? স্যার কিন্তু পুরো বই একসঙ্গে দেন না, অল্প দেন। আবার সেগুলো লিখে উনার কাছে যেতে হয় এমনভাবে করে দেন। এমন দেওয়া নেওয়া হতে হতে উনার সঙ্গে আরও ঘনিষ্টতা বাড়লো। স্যারের গল্পগুলো শুনতাম। এই যে একটা মানুষের সান্নিধ্যে যাওয়া, তাঁর কথা শোনা এটা আমাকে বেশ আনন্দ দিয়েছে। এমন অনেক লেখক রয়েছেন। যেমন সৈয়দ শামসুল হকের কাছে যখন গিয়েছি তিনি আমাকে সন্তানতুল্য অভিহিত করেছেন। তিনি যখন গল্প করতেন তখন মনে হতো একজন লেখক শুধু লেখক না তিনি ভালো গল্পও করতে পারেন। এমন অনেক লেখকের সান্নিধ্য আমাকে আনন্দ দিয়েছে। বিশেষ করে লেখকের কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি আনা, বারবার যোগাযোগ করা এসব বেশ ভালো লাগে। অনেক সময় আশা করে থাকলেও পাণ্ডুলিপি পাই না। যখন পাই তখন সেই আনন্দটা বলে বোঝানোর মতো না।
আপনিতো কিছু রাজনৈতিক পাণ্ডুলিপিও করেছেন?
দেখবেন বর্তমান বা আগের লেখকদের পাণ্ডুলিপির পাশাপাশি আমি কিছু রাজনৈতিক পাণ্ডুলিপিও করেছি। তাদের সান্নিধ্যেও যখন আমি গিয়েছি তখন প্রতিটি ঘটনাই আমাকে আনন্দ দিয়েছে। যে তাদের একটা বই আমি করতে চেয়েছি এবং সহজেই পেয়ে গেছি।
কষ্টের কোনো ঘটনা?
কষ্টের ঘটনাটাও হুমায়ূন স্যারকে নিয়ে। প্রতিনিয়তই বেদনা দেয়। তিনি অসুস্থ হওয়ার আগে আমরা বসলাম। স্যার দুটি প্রেমের উপন্যাস দিতে চান। একটি কোম্পানির সঙ্গে মিলে সারাদেশে বিলবোর্ড করার কাজ হাতে নিলাম। স্যার একটি বইয়ের নামও ঠিক করে দিলেন ‘চন্দ্রসখা’। ৩-৪ পাতা লিখেছিলেন। এই দু’টো বই দিয়ে নাটক বা সিনেমা করারও পরিকল্পনা ছিল। মানে বিশাল একটা কর্মযজ্ঞ। কিন্তু পরে স্যার চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যান। বাকি ঘটনাতো আপনারা জানেন। তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এটা যখনই মনে হয় মর্মাহত হই।
তাহলে ‘চন্দ্রসখা’ বইটি আর হয়নি?
স্যার যেভাবে চেয়েছিলেন হয়নি। কিন্তু হুমায়ূন স্যারের মৃত্যুর পর মেহের আফরোজ শাওনের অনুমতি নিয়ে পাঁচটি প্রেমের উপন্যাস নিয়ে একটি বই বের করা হয়েছে। মূল চন্দ্রসখা হয়নি।
প্রকাশনা ব্যবসার এখন কী অবস্থা বা লেখকরা কতোটুকু ভরসা জোগাতে পারছেন?
লেখকের জনপ্রিয়তার কতোগুলো ধাপ আছে। একেক সময়ে একেকজন জনপ্রিয় হন। যারা জনপ্রিয় হন একসময় আবার ভাটাও পড়ে। কিন্তু আমরা চাই শুধুমাত্র জনপ্রিয় লেখক নিয়ে থাকবো, তা যেন না হয়। সব ধরনের লেখকের বই আমরা প্রকাশ করতে চাই। যেমন-এবারের বইমেলার কথা যদি বলি, এবার কিন্তু হাইপে উঠা কোনো লেখক নেই। সবার বই মোটামুটিভাবে চলছে।
