‘আমার ঠোঁটের পরে
রাখো তোমার তীব্র নেশা;
খানিকটা তার তাৎক্ষণিকের
খানিকটা তার চিরকালের’
(সকল প্রেম: নাজমুন নেসা পিয়ারি)
বাংলা সাহিত্যের সুপরিচিত কবি প্রয়াত শহীদ কাদরী। তাঁর প্রিয়তমা কবি নাজমুন নেসা পিয়ারি। ১৯৭০ সালে তাদের প্রেম এবং ১৯৭১ সালে বিয়ে হয়েছিলো। মহান মুক্তিযুদ্ধের ভয়ংকর দিনগুলোতে যখন তাদের যোগাযোগ বজায় রাখা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাদের প্রেমের সম্পর্ককে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বিয়ে জরুরি হয়ে পড়ে। যুদ্ধের মধ্যেই কোর্টে বিয়ে করেন তারা। শহীদ কাদরীর অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ কবিতাটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন এই নাজমুন নেসা পিয়ারিকে নিয়েই। কবিতাটি পরবর্তীতে তার বন্ধু কবীর সুমনের কণ্ঠে জনপ্রিয় গান হিসেবে শ্রোতাদের মন জয় করে।
সেই সময়ে যৌবনের উচ্ছ্বল দিন। সব অনুভূতিই যেন তীব্র। শহীদ কাদরীর বেছে বেছে নেওয়া উপমা আর শব্দগুলো যেন তীব্র থেকে তীব্র। সেই অনুভূতির কথা জানতে চাই শহীদ কাদরীর প্রিয়তমা কবি নাজমুন নেসা পিয়ারির কাছে।
‘আমাদের বাড়িটা তখন বেশ রোমান্টিক জায়গায় ছিলো। পুরানা পল্টনে বাঁশঝাড় ছিলো, মাঠ ছিলো। সেখানে ছেলেরা ছবি আঁকতে আসতো। আমিও তখন বেশ ভাবুক প্রকৃতির ছিলাম। আমার পড়ালেখার ঘরটা ছিল জানালার পাশে। পড়ার টেবিলে বসে আমি দূর আকাশের তারা দেখতাম। একটা তারাকে আমার নিজস্ব তারা ভাবতাম। এখন জার্মানিতে বসে তারা দেখলেও ভাবি ওই তারাটা আমার কাছে চলে এসেছে। বাড়ির সামনে বেশ ফুলের বাগার ছিলো। হাসনাহেনার গন্ধ ভেসে আসতো। সেই গন্ধে ভাবনায় ডুব দিতাম। তখন দৈনিক পাকিস্তানে আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয়।
শহীদ কাদরীর সঙ্গে পরিচয় কীভাবে?
‘এক আসরে ও কার যেন একটা কবিতা পড়ছিলো। মাঝের একটা লাইনের পর পরের লাইনটা মনে করতে পারছিলো না। আমি বলেছিলাম সেই লাইনটা তখন আমার দিকে সে তাকালো আর কি? আমি যখন সিদ্বেশ্বরী কলেজে পড়াতাম তখন সে অফিস ফাঁকি দিয়ে রমনা পার্কে এসে বসে থাকতো। সে বন্ধুদের দিয়ে মেসেজ পাঠাতো, কাদরীর শরীর ভালো না সে অফিসে যায়নি। এভাবে আমাকে নিয়ে যেত। বাসায় একটা ওষুধের শিশি ইচ্ছে করে রেখে দিতো। এটা দেখাতো যে সে খুব অসুস্থ। আসলে আমাকে দেখার ফাঁদ আর কি!’
‘সারাদিন বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো, কখন আমি বের হবো। আমার বাড়ির পাশে যে মাঠ ছিল সেখানে ভোর বেলায় এসে ওর বন্ধুদের নাম ধরে ডাকতো। টুটু, বটু এসব নাম ধরে ডাকতো। আসলে ঘর থেকে যাতে আমি দেখতে পাই। রেসপন্স করি।’
প্রেমটা ঠিক কখন হলো?
‘আমি আসলে অস্থির চঞ্চল প্রকৃতির ছিলাম। সে সময় রসায়নে পড়ার পাশাপাশি কবিতার প্রতি আগ্রহ জন্মে। ওর তীব্র ভালোবাসা ছিলো যার কারণে ও আমাকে টানতে পারতো। আর প্রেম চিরকালই একরকম। ও ছাড়তে চাইতো না। সকালে হয়তো বের হয়েছি। রমনার লেকের পাড়ে একটা রেস্টুরেন্ট ছিলো। ওখান নয়তো কোনো চাইনিজ রেস্তোরাঁতে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে যেত। ও ছাড়তে চাইতো না। এরপর ঘরে ঢুকলে মা এমনভাবে আমার দিকে তাকাতো অস্বস্তি লাগতো।’
তখন কী ল্যান্ডফোনে কথা হতো আপনাদের?
‘না না ফোন লাগতো না। ও সকালে উঠেই আমার বাসার আশেপাশে চলে আসতো। শহরের সবাই জানতো কাদরী আর আমার প্রেমের কথা।’
তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা কখন লেখা হলো?
‘সেটা যুদ্ধের সময়েই। বাংলা একাডেমি থেকে যে উত্তরাধিকার পত্রিকা বের হয় সেটাতে প্রথম ছাপা হলো। বিয়ের পরপরেই সে প্রথম বইটার জন্য পুরস্কার পেলো। আমাদের বিয়ের একটা ইতিহাস আছে। যুদ্ধ শুরুর পর আমরা তিনবোন ও এক ভাইকে নিয়ে বাবা মা দূরে পাঠিয়ে দিলেন। কিছুদিন থাকার পর যখন ফিরলাম তখন কাদরী কারফিউ ভেঙে চলে এসেছে। এসে বলছে, আবার যদি তোমাকে দূরে পাঠিয়ে দেয় তখনতো আমি কিছু বলে আটকাতে পারবো না। তো আমাদের সিদ্ধান্ত হলো বিয়ে করে ফেলার। চারিদিকে মানুষ মরছে খারাপ লাগছে। আবার ও নাছোড়বান্দা। আমার বোনের একটা নতুন শাড়ি ছিলো সেটা পরে চলে গেলাম। শুধু রেজিস্ট্রি বিয়ে। আমার পরিবারের কেউ জানতেন না। এটা করা হয়েছে যাতে আমাকে কোথাও নিয়ে গেলে সে দাবি করতে পারে বউ হিসেবে।’
‘আমি যখন ফ্রেঞ্চ ক্লাবে যেতাম তখন বন্ধুরা তোমাকে অভিবাদন কবিতাটি আওড়াতো। অভিবাদন ও প্রিয়তমা একইভাবে আনা এটা কিন্তু দেখা যায়নি। যেটা শহীদ কাদরীর পক্ষেই সম্ভব। তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা বইয়ের উৎসর্গপত্রে শহীদ কাদরী লিখেছিলেন, ‘পিয়ারিকে, গানগুলো যেন পোষা হরিণের পাল, তোমার চরণ চিহ্নের অভিসারী’।
নাগরিক কবি হয়ে উঠার এবং বাংলাদেশের কবিতায় এককভাবে প্রতিনিধিত্ব করার একমাত্র উদাহরণ শহীদ কাদরী। যে বেলফুল কৃত্যানুষ্ঠান এবং ঐতিহ্যের লালিত্য তাঁর হাতে নতুন নির্মাণ লাভ করেছে সেই বেলফুলকে নাগরিক প্রতিবেশে প্রিয়তমার কাছে নতুন মূল্যে প্রতিষ্ঠা করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,
‘ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো-
স্টেটব্যাঙ্কে গিয়ে
গোলাপ কিংবা চন্দ্রমল্লিকা ভাঙলে অন্তত চার লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে
একটি বেলফুল নিলে চারটি কার্ডিগান।’
(তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা)
নাজমুন নেসা পিয়ারির বইগুলোর মধ্যে রয়েছে, প্রেমে অপ্রেমে, কবিতার বরপুত্র শহীদ কাদরী, জার্মানবাসী বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সত্তার অসীম আকাশ, দু'জন জার্মান নোবেল বিজয়ী লেখকের দু’টি উপন্যাস অনুবাদ করেছেন। পিয়ানো টিচার (এলফ্রিডে ইয়েলিনেক), নিশ্বাসের দোলা (হারটা ম্যুলার)। ডয়চে ভেলে-তে তিনি বিভিন্ন বিভাগে চাকরি করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। দু’টি বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন। শহীদ কাদরীর ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’, এবং নিজের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই ‘সত্তার অসীম আকাশ’।
