লোকপ্রশাসন বিষয়ের পরিধি ও প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। লোকপ্রশাসন হচ্ছে মালটিডিসিপ্লিনারি ও মালটিস্ট্রাকচারাল বিষয়। যেটি মূলত সরকারের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এছাড়া সরকারি প্রশাসনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং ম্যানেজমেন্ট, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আইন, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ, পাবলিক পলিসি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাদি হচ্ছে লোকপ্রশাসনের ফোকাস এরিয়া। প্রশাসকরা হলেন মালটিডিসিপ্লিনারি মানুষ। তাই লোকপ্রশাসন বিভাগে পড়ানো হয়, কীভাবে একজন দক্ষ প্রশাসক হতে হয়। লোকপ্রশাসনে পড়াশোনা করলে বিসিএস, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পড়ার অনেক সুযোগ রয়েছে।
এখন আসি লোকপ্রশাসনের মূল উৎস ও এর পূর্ণ বিস্তার নিয়ে ব্যাখ্যা। লোকপ্রশাসন হচ্ছে সরকারের যাবতীয় কর্মপরিধি, যা সরকার জনগণের চাহিদা পূরণের জন্য নানাবিধ জনকল্যাণমূলক পরিকল্পনা, পলিসি, প্রোগ্রাম ও প্রকল্প গ্রহণ করে থাকেন। যেখানে প্রশাসন সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকারের কেন্দ্রে অবস্থান করেন। পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার আঁচড় লেগেছে, যখন সমাজব্যবস্থা ছিল আদিম। সে সময় সমাজব্যবস্থা পরিবর্তন হতে থাকে, যেমন—দাসপ্রথা, সামন্তবাদ ও ভূমিভিত্তিক রাজ্য ও শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ফলে সুনির্দিষ্ট আইনকানুন তৈরি করেন, প্রতিরক্ষা বাহিনীর খরচ বহনের জন্য রাজস্ব উত্তোলন করা, শৃঙ্খলা রক্ষা ও বিচারব্যবস্থা ছিল মুখ্য প্রশাসনিক কাজ। পরবর্তীকালে প্রাচীন গ্রিসে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে এবং ইউরোপে—রাশিয়া, জার্মান, ব্রিটিশ ও ফ্রান্স সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা লেগে যায়। তাই উড্রো উলসন ১৮৮৭ সালে তার ‘The Study on Public Administration’ শীর্ষক প্রবন্ধটি ‘Political Science’ পত্রিকায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রশাসন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং লোকপ্রশাসন ধীরে ধীরে একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। সেখানে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও প্রশাসনকে আলাদা স্টাডি ফিল্ড হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘Political questions are not administrative questions.’ তাছাড়া তিনি সরকার এবং সরকারের তিনটি উইং আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ নিয়ে আলোচনা করেন। বিংশ শতাব্দীতে নিকোলাস হেনরি ছয়টি প্যারাডাইম শিফটে ভাগ করেন। মূলত লোকপ্রশাসন বিংশ শতাব্দীতে তার নিজস্ব রূপে ফিরতে শুরু করে।
আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিষয়টি অধ্যয়ন ও গবেষণা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে দেশের অনেকগুলো সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে ‘পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ মন্ত্রণালয় রয়েছে। যেটি ২০১১ সাল থেকে এ নামকরণ করা হয়। তবে এর সূচনা হয়েছে ‘হোম ডিভিশন’ নামে। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ‘সংস্থাপন’ মন্ত্রণালয় নামে দুই দশকেরও বেশি সময় প্রচলিত ছিল। মোটকথা, সরকারের নীতিমালা প্রণয়ন থেকে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন পর্যন্ত লোকপ্রশাসনের পরিধি ও বিষয়বস্তু। যেমন—বাজেট, অর্থনীতি, স্থানীয় সরকার, পাবলিক এন্টারপ্রাইজ, সংবিধান, সরকারি কর্মচারী নিয়োগ, বেতন, কর্মপরিধি, কনডাক্ট রুলস, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স, সচিবালয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিষয়টি শিক্ষা ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত নয় এবং নেই প্রশাসন ক্যাডারে বিশেষ সুবিধা। বর্তমানে পিএসসি অধীনে ২৬টি ক্যাডার সার্ভিস রয়েছে। যেখানে ঐ ক্যাডারদের ফাউন্ডেশন ট্রেনিং কোর্সে লোকপ্রশাসনের ওপরই ১ হাজার ৫০০ নম্বরের পরীক্ষা হয়। অন্যদিকে একজন লোকপ্রশাসনের শিক্ষার্থী এই ফিল্ডে চার থেকে পাঁচ বছর অধ্যয়ন করেন। কিন্তু বিভিন্ন সাবজেক্টের শিক্ষা ক্যাডার থাকলেও এই বিষয়টি এখনো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে এই বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উপরন্তু বিষয়টি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিভাগগুলোতে শিক্ষা ক্যাডার হিসেবে সম্পৃক্ত করলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতা করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদীন যাবৎ কাজ করে যাচ্ছেন বলে শোনা যায়। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার কারণে বিষয়টির বিহিত হয়নি। ২০১৯ সালে দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ক্যাডারে যুক্ত করার একযোগে দাবি জানিয়েছিল। তখন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিভিন্ন মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে ‘আশার আলো’ কিছু জেগেছিল বটে, কিন্তু হঠাৎ করোনার কারণে আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় লোকপ্রশাসনকে শিক্ষা ক্যাডারে অন্তর্ভুক্তের বিষয়টি কর্তৃপক্ষ খুব ভালোভাবে আমলে নিয়ে কার্যকর ও সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
