‘নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়’

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৩:২৩

পৃথিবীতে ৭ হাজারের বেশি ভাষা আছে, কিন্তু বাঙালির মনের সূক্ষ্ম আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ শুধু বাংলাতেই সম্ভব। জলের তৃষ্ণা যেমন শরবতে মেটানো যায় না, তা সে যত দামি ফলের শরবতই হোক না কেন, ঠিক তেমনি নিজ মাতৃভাষা ছাড়া অন্যের ভাষায়ও ভাবের তৃষ্ণা মেটানো যায় না। বাঙালির মাতৃভাষা তার ভাইয়ের রক্তে অর্জিত সম্পদ। তারা প্রমাণ করে দিয়েছিল ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত বাঙালি কখনোই মেনে নেয় না, আর নেবেও না। বিশ্বে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে, যার নেপথ্যে ছিল বাঙালির অদম্য ভাষাপ্রীতি।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি শুধু একটি দিন নয়, তা ছিল বাঙালির আত্মজাগরণের প্রথম পদক্ষেপ। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম আন্দোলন ছিল মাতৃভাষাকেন্দ্রিক। পাকিস্তান সৃষ্টির আগে থেকে শুরু হওয়া ভাষাবিতর্ক চলমান ছিল ১৯৫৬ সালে, সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আগ পর্যন্ত। ভাষাকে কেন্দ্র করে ১৯৫২ সালে একত্রিত হওয়া পূর্ব বাংলার মানুষগুলোই একসময় ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তির জন্য লড়াই করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল। বাঙালি প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাকে দিয়েছিল বিশ্ব দরবারে অনন্য মর্যাদা।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে বোঝা যায় ২১শে ফেব্রুয়ারির গুরুত্ব ও তাৎপর্য। এ দিবসে প্রত্যেক ভাষাভাষী মানুষের উচিত, নিজের মাতৃভাষাকে যেমন ভালোবাসে, ঠিক সেভাবেই অন্য জাতির মাতৃভাষাকে ভালোবাসা, সম্মান করা। একুশকে চেতনায় ধারণ করে মাতৃভাষাকে ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হওয়ার নজির আছে বিশ্বে। সিয়েরা লিওনে বাংলাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। অথচ বাংলার তাজা প্রাণের রক্তে রঞ্জিত রাজপথ আজও শুকোয়নি। কিন্তু বাংলা ভাষার মর্যাদা পদে পদে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে এই তরুণ প্রাণের দ্বারাই।

বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় বাঙালি সংস্কৃতিতে এসেছে পরিবর্তন। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে ‘পশ’ শব্দটি এখন অনেক বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তরুণদের মধ্যে। নিজ ভাষা নয়, বরং অন্য ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে তারা। বই নয়, ফেসবুক তাদের প্রথম পছন্দ। বইয়ের নির্দিষ্ট জ্ঞান নয়, তারা বিভ্রান্ত হয় ফেসবুকের লাইক, কমেন্টে। ভাষার মাস, বইমেলার মাস তাদের কাছে নিছক একটি দিবসে পরিণত হয়েছে। হৃদয়ে প্রশ্ন জাগে, নিয়তই ভাষার মাসের তাৎপর্য হৃদয়ে ধারণ করে কয়জন! বাঙালির অন্যান্য দিবসের মতো এই দিনটিও এখন শুধুই একটি দিবসে পরিণত হয়েছে। ২১শে ফেব্রুয়ারিতে শহিদ মিনার প্রাঙ্গণ ফুলে ফুলে শোভিত হয়, নগ্ন পায়ে শহিদ মিনারের হাজার মাইল দূর থেকে মানুষ হেঁটে আসে। কিন্তু বাকি দিনগুলো? বাকি ৩৬৫ দিনই শহিদ মিনারের প্রতি দেখানো হয় অবজ্ঞা, কেননা বাঙালির সবকিছু যেন এক দিনের জন্য।

পাঠ্যপুস্তকে ভাষা, জাতি, রাষ্ট্র নিয়ে নানা তথ্য-উপাত্ত থাকলেও তা কতটুকু ধারণ করে শিক্ষার্থীরা? এর উত্তর হবে—জিপিএ ফাইভ পাওয়ার জন্য যতটুকু লাগে ঠিক ততটুকুই। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য শুধু মুখস্থ করে যেসব খাতায় উগলে দিয়ে আসা হয় তার মধ্যে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা, সংস্কৃতির বিষয়গুলোও রয়েছে। বিভিন্ন চাকরি ও উন্নত জীবন যাপনে মাতৃভাষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অন্যান্য ভাষাকে। উন্নত জীবনের আশায় বাংলাকে অবজ্ঞা করে যারা শুধু বিদেশি ভাষাকে করে নিচ্ছে আশ্রয়, আপন, তারা বাংলাকে মূলত অবহেলাই করছে। তাদের জন্যই হয় তো মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম বলেছিলেন, ‘দেশি ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়/ নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।’

ভাষার মাসে একটাই প্রত্যাশা—বাংলা হোক জীবনের প্রতিটি পদে বাঙালির সঙ্গী। অন্য ভাষায় নয়, নিজ মাতৃভাষাতেই বাঙালির গর্বিত চিত্ত, মনন ও সৃজনশীলতার বহুমুখী প্রকাশ ঘটুক।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন