এবার প্রকাশিত রুমা মোদকের গল্পের বইয়ের নাম ‘মর্জিনা খাতুনের অষ্টপ্রহর ও অন্যান্য গল্প’। নালন্দা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এ সংকলনে রয়েছে ১২টি গল্প।
তার গল্প সম্পর্কে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘রুমা মোদকের গল্প সুখপাঠ্য নয়, কারণ তিনি পাঠকের মন যোগাবার জন্য লেখেন না বরং তার মনে চিন্তা, প্রশ্ন এবং সক্রিয়তা জাগানোর জন্য লেখেন। গল্পগুলো শিল্পের মাত্রা স্পর্শ করে ছাড়িয়ে যায়; ভাষা সৌকর্যে, গঠন-কাঠামোয় তারা আকর্ষণীয়। কিন্তু প্রতিটি গল্প এমন কিছু প্রসঙ্গের অবতারণা করে, যেগুলো পাঠকের স্বস্তি কেড়ে নেয়। এগুলো নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তার চিন্তার এবং কর্মের সক্রিয়তার প্রয়োজন হয়।
সমাজের ভেতর নানা অসংগতি, বৈষম্য, অবিচার, সাম্প্রদায়িকতা, ভিন্ন জাতিসত্তার প্রতি অবজ্ঞা, নারীর প্রতি উগ্র রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা ও নানা কেন্দ্রের প্রতি মোহ যতো বাড়ছে রুমার গল্প ততো তীক্ষ্ণ হচ্ছে। তার গল্প পড়ে আমার মনে হয়েছে শিল্পের কাছে বিশ্বস্ত থেকেও জীবনের ও সমাজের কাছে কীভাবে বিশ্বস্ত থাকা যায়, সেসব তার প্রমাণ।’
এ প্রসঙ্গ ধরেই শুরু করি। অনেক পাঠক বা বোদ্ধারা বলে থাকেন আপনার গল্পগুলো কঠিন। বিষয়টা কতোটা যৌক্তিক?
আমার লেখা আসলে কঠিন নয়। আমি আসলে পাঠকের মনোযোগ প্রার্থনা করি। সবাই তো চান নিজস্ব সিগনেচার তৈরি করতে। ভাষা বা আঙ্গিক দিয়ে যাতে চেনা যায় এটা রুমা মোদকের গল্প। সেই জায়গা থেকে আমি লিখে যাই। এটাই আমার রীতি। আমি মনে করি লেখার ক্ষেত্রে লেখকের যেমন একটা পরিশ্রম রয়েছে তেমনি পাঠকেরও একটা মনঃসংযোগ দরকার। পাঠক সহজেই পড়ে ফেলুক, পড়ে আনন্দ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুক সেটা আমার কাম্য নয়। আমি চাই গল্পটা পাঠকের হৃদয়ে অনেকক্ষণ থাকুক। তার হৃদয়ে অনুভূতির সৃষ্টি করুক। পাঠক ভাবলেই কিন্তু তার মধ্য থেকে একটা ক্রিয়া আসবে। আমি যে জিনিসগুলো বা সংকট বা বৈষম্য নিয়ে লিখছি এর মধ্যে যদি একজনও ক্রিয়াশীল হয় সেটাই আমার প্রত্যাশা।
আপনার লেখার উপাদান কীভাবে সংগ্রহ করেন?
প্রান্তিক অঞ্চলে বসবাস করার কারণে আমি জীবনের বৈচিত্র্য দেখি, বিচিত্র মানুষ দেখি। নিজের আগ্রহের কারণে হোক, লেখক সত্তার কারণে হোক বা সংবেদনশীলতার কারণেই হোক যেটা করি মানুষকে দেখেই শুধু ক্লান্ত হই না তাকে ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করি, তার সংকট দেখার চেষ্টা করি, তার সম্ভাবনা দেখার চেষ্টা করি। ছোটোখাটো বিভিন্ন সমস্যার বীজ হয়তো আমার কাছে বিশাল বৃক্ষ হিসেবে ধরা দেয়। এ বইয়েও যে বারোটি গল্প আছে সেগুলোও আমার চারপাশের গল্পের বীজ থেকে নেওয়া।
মর্জিনা খাতুনের অষ্টপ্রহর ও অন্যান্য গল্পের বইয়ে যেসব গল্প রয়েছে সেগুলো হলো, মর্জিনা খাতুনের অষ্টপ্রহর, দালির ঘড়ি, একটি গেম কিংবা একটি কামিনী গাছের চারা, যখন নেমেছিল আঁধার, কিরণবালার অন্তিমযাত্রা, মন নাই কুসুম, মৎস্য পুরাণ, রাক্ষস কিংবা মানবের ইতিবৃত্ত, সান্ধ্য কফির ধোঁয়া, সেই ভোর, সরল সমীকরণ, সূর্যমুখীর ছটা।
গল্পগুলো বা বিশেষ কোনো গল্প লিখতে গিয়ে কোনো ঘটনার কথা কী মনে পড়ে?
আমি যে গল্পগুলো এখানে লিখেছি বা আমি যে গল্পগুলো লিখি সেগুলোর একটাও বানানো গল্প নয়। আমি কোথাও না কোথাও সে গল্পগুলো দেখেছি বা শুনেছি। হয়তো সেভাবে দেখেছি বা শুনেছি সেভাবে নয়, আমি আমার সৃজনশীলতা প্রয়োগ করেছি। গল্পের চরিত্র, প্লট অনেক কিছু আমার জানাশোনার মধ্যে।
আপনি কম লিখেন, কিন্তু পাঠক তো আপনার লেখা আরও চান?
আমি লিখি খুব কম এটা ঠিক। তিন বছর পর আমার একটা গল্পের বই এলো। এই বারোটা গল্প আমি গত তিন বছরে লিখেছি। কম লিখি কারণ এর বেশি আমি লিখতে পারি না। বছরে চারটা থেকে পাঁচটা গল্প আমি লিখি। এর বেশি আমি পেরে উঠি না। কারণ একটা গল্প নিয়ে আমাকে অনেক বেশি ভাবতে হয়। যেমন ঈদ সংখ্যার একটা তাড়া থাকে। তখন হুটহাট হয়তো একটা গল্প আমাকে লিখে দিয়ে দিতে হয়। কিন্তু এরপর গল্পটি যখন আমি বইয়ে সংকলিত করি তখন আমাকে অনেক কাজ করতে হয়। এরপর ব্যক্তিগত ব্যস্ততা রয়েছে। আমি থিয়েটার করি, নাটক লিখতে হয়, রিহার্সালে সময় দিতে হয়। সংসার-সন্তানাদি রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে পড়ার সময় লেখার সময়। তাই এর বেশি লেখা হয়ে উঠে না।
আপনার লেখালেখিতে বিশেষ কারও প্রভাব আছে বলে কী আপনি মনে করেন?
এটা আমি একদমই মনে করি না। আমি পড়ার ব্যাপারে সর্বভুক। যা পাই তাই পড়ি। সব লেখককে আমি পড়ি। পড়ার ক্ষেত্রে আমি যেমনই হই লেখার ক্ষেত্রে আমি একদম রুমা মোদক হয়ে যাই। আমি মনে করি না আমার যে নিবিষ্ট পাঠক সে আমার সঙ্গে অন্য কারও ভাষার সংযোগ খুঁজে পাবে।
এর আগে প্রকাশিত বইগুলো সম্পর্কে জানতে চাই?
বিভিন্ন প্রকাশনীতে আমার সাতটা গল্পের বই আছে। এর মধ্যে জলধি থেকে প্রকাশিত ‘এই সব প্রেম মোহ’ দ্বিতীয় সংস্করণে যাচ্ছে। প্রতিটা গল্পই আসলে আমার প্রিয়। প্রতিটি গল্পের পেছনে আমি সময় ব্যয় করি। পাঠক যদি মনোযোগ দিয়ে পড়েন তাহলে তার ভালো লাগবে। আমার একটি গল্প আছে ‘প্রসঙ্গটি বিব্রতকর’ এটা পড়ে আমি পাঠকের প্রচুর প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এর চেয়ে ভালো গল্প আমার আছে। কোনো গল্প লিখেই মনে হয় না আমি তৃপ্ত হয়েছি। আমার কাছে মনে হয় আমি যা লিখতে চেয়েছি বা আমি যা বলতে চেয়েছি তা এখনো লিখতে পারিনি বা বলতে পারিনি। আমার পরিবেশ সমাজ প্রতিবন্ধকতা এবং আমার সীমাবদ্ধতা সব মিলিয়ে আমার মনে হয় প্রিয় লেখাটা এখনো লিখতে পারিনি।
সামনে কী নিয়ে কাজ করছেন?
আমি একটা উপন্যাসটা লিখেছি। এটা আমার প্রথম উপন্যাস। কথা হয়েছিলো এটা প্রকাশে যাবে। তারপরও আমি দেইনি কারণ এটাতে আমি আরও বেশি শ্রম দিতে চাই। এটা আগামী বইমেলায় প্রকাশ করতে পারবো। তারপর থেকে আমি উপন্যাসেই বেশি মনোযোগ দেব।
তাহলে কী পাঠক রুমা মোদকের ছোটগল্প আর পাবে না?
লিখবো, তবে হয়তো খুব বেশি ছোটগল্প আমি লিখবো না। প্রথমে কিন্তু আমি কবিতা লিখতাম পরে ছোটগল্প লেখা শুরু করলাম কারণ আমার মনে হচ্ছে আমি যা বলতে চাই সেটা কবিতায় বলতে পারছি না। এখন মনে হচ্ছে গল্পেও সব বলা হয়ে উঠছে না। আরও বড় ক্যানভাসে আমি যাবো।
বিষয়বস্তু কী বলা যাবে?
নব্বই দশক থেকে আমরা এই জায়গায় এসেছি সেটা একটু স্বপ্নের সময় ছিল। আমরা কিন্তু একটা অন্যরকম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। যে স্বপ্ন হয়তো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর মানুষ দেখেছিল। কিন্তু অনেক দিক থেকে আমরা আদর্শিকভাবে পিছিয়ে গেছি। কেনো পিছিয়ে গেলাম? নব্বইয়ের দশকের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের একজন যোদ্ধা হিসেবে আমার যে পর্যবেক্ষণ সেটা আমি উপন্যাসের মাধ্যমে তুলে ধরেছি।
