চট্টগ্রামের ট্যানারি শিল্পে সুবাতাস নেই। একদিকে সবুজ বিধিবিধান বা গ্রিন কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়নে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক কমিটির নজরদারি, পাশাপাশি দেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বিধিবিধান অক্ষরে অক্ষরে পালনের বাধ্যবাধকতায় গত এক যুগ সময়কালে চট্টগ্রামে বন্ধ হয়ে গেছে ট্যানারি শিল্পের ২১টি কারখানা। ফলে এই শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বলে পরিচিত চামড়ার আড়তদারি এবং ঈদসহ নানা পার্বণে চামড়ার মৌসুমি ব্যবসাও ব্যাপকভাবে মার খেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ইত্তেফাককে জানান, বর্তমানে পরিবেশ অধিদপ্তরের সব ধরনের নিয়মবিধি এবং গ্রিন কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়ন করে কালুরঘাটে টিকে আছে রিফ লেদার লিমিটেড নামের চট্টগ্রামের একমাত্র ট্যানারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি প্রক্রিয়াকরণকৃত পাকা চামড়া রপ্তানিও করছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পরিচালক হিল্লোল বিশ্বাস ইত্তেফাককে বলেন, ট্যানারি শিল্পে পরিবেশ সুরক্ষায় অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপনসহ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সব বিধিবিধান বাস্তবায়নে কোনো শৈথিল্য দেখানোর সুযোগ নেই। যারা বিধিবিধান লঙ্ঘন করবেন তাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণের দায়ে ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের ও ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায়ের বিধান বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ সার্টিফিকেট এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশ অধিদপ্তরের বার্ষিক ছাড়পত্র গ্রহণ তাই বাধ্যতামূলক। এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে যে কমপ্লায়েন্স তা বাস্তবায়ন করতে না পেরে চট্টগ্রামের নানা ধরনের ট্যানারি শিল্প প্রতিষ্ঠান নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো ট্যানারিকে অনুমোদন দেওয়া হবে না।
নগরীর কালুরঘাটস্থ ট্যানারি রিফ লেদার লিমিটেডের পরিচালক মুখলেসুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সালে ইটিপি বাস্তবায়ন করে। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক কমিটি লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ তাদের কারখানা পরিদর্শন করে গেছে। কমিটি গত ফেব্রুয়ারিতে এই কারখানাকে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ সার্টিফিকেট প্রদান করেছে। দুই বছর পর পর এই কমিটির অডিট গ্রুপ সরেজমিনে কারখানা পরিদর্শনে আসে। এই সার্টিফিকেট ছাড়া ট্যানারি শিল্প পরিচালনা করা যায় না। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কমিটি স্থানীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের বার্ষিক ছাড়পত্রও দেখতে চায়। আন্তর্জাতিক ওয়ার্কিং গ্রুপের পর্যবেক্ষণে ট্যানারিতে স্বাস্থ্য সুবিধা, ব্যবস্থাপনাসহ আন্তর্জাতিক মানের সব সুযোগসুবিধাও দেখতে চায়। ফলে সাধারণ কোনো ট্যানারি শিল্প বা কারখানার পক্ষে এগুলো বাস্তবায়ন অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন রিফ লেদার কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে তাকে পাকা চামড়ায় বা ফিনিশড প্রোডাক্টে রূপান্তর করে থাকে। তারা গত বছর চামড়া রপ্তানি করেছিলেন ৫০ লাখ বর্গফুট। আসন্ন বছর তাদের রপ্তানির পরিমাণ আরো বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
মুখলেসুর রহমান জানান, একটি ট্যানারিতে ইটিপি বাস্তবায়নে বর্তমানে কমপক্ষে ৩ কোটি থেকে ৪ কোটি টাকার প্রয়োজন। আর একটি ইটিপির জন্য কমপক্ষে ৩ থেকে সাড়ে ৪ হাজার স্কোয়ার ফুট ভূমি প্রয়োজন। ফলে সাধারণ ট্যানারি শিল্পের উদ্যোক্তারা এই প্রতিবন্ধকতা দেখে এই শিল্প থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের উপপরিচালক মিয়া মাহমুদুল হক ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রামের আরো একটি বৃহৎ ট্যানারি শিল্প কারখানা ‘মদিনা ট্যানারি’কে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের দায়ে ২০১৮ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
চট্টগ্রামে চামড়া আড়তদার সমিতির নেতারা বলেন, ২০১৮ সালে মদিনা ট্যানারি বন্ধ হওয়ার পর চট্টগ্রামে কাঁচা চামড়ার আড়তদারি ব্যবসায় হঠাৎ ধস নামে। কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর কোরবানির ঈদে চট্টগ্রামের ৫০ শতাংশ চামড়াই কিনত।
রিফ লেদার লিমিটেডের পরিচালক মুখলেসুর রহমান জানান, মদিনা এখন চামড়া প্রক্রিয়াকরণ না করলেও তারা জুতা তৈরির কারখানা চালায়।
