লেখক গিয়াস আহমেদ লেখায় বেশ খুঁতখুঁতে। তিনি যথেষ্ট পরিশ্রম করে লেখেন। নতুন নতুন শব্দ খোঁজেন। পাঠককে জানাতে চান ঘটনার আদ্যোপান্ত। তাই তিনি কম লিখেও পাঠক সমাদৃত। এবার ‘ভাষাচিত্র’ প্রকাশ করেছে তার চতুর্থ বই ‘কবি কহিছেন’।
গিয়াস আহমেদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম এই বইয়ের মূল উৎস সম্পর্কে। তিনি বলেন, ‘আমি পর্যবেক্ষক হিসেবে বেশ ভালো। চারদিকের মানুষ, প্রকৃতি এসব বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখি। এই যে ঢাকা বিশাল একটি শহর, এই শহরে অনেক রকম মানুষ থাকেন। একদিন রাস্তায় একটা পাঞ্জাবি পরা যুবককে দেখে আমার ভালো লাগলো। উদাস মনে তাকিয়ে আছে। কিছু তাকানো আছে যা আমি দেখছি আবার দেখছি না। নিঃস্পৃহ, নির্মোহ একটা দৃশ্য। দেখে আমার এই ভাবনাটা এলো। এ শহরে প্রকৃতপক্ষে আমরা বিচ্ছিন্ন একটা মানুষ।’
‘এ প্রসঙ্গে আরেকটা ঘটনা বলি, একবার দেখলাম রাস্তার মাঝখানে একটা অন্ধ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। আশপাশে গাড়ি যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না কী করবে। সামনেও যেতে পারে না পেছনেও যেতে পারছে না। কেউ তাকে সাহায্যও করছেন না। এই শহরে সবাই আসলে নিঃসঙ্গ। কেউ কারও হাত ধরে না। একজন মানুষ যদি জীবনটাকে এভাবে দেখেন সে একলা। তার আশেপাশে প্রচুর মানুষ, প্রচুর গাড়ি, প্রচুর শব্দ। কিন্তু তার হাত ধরার কেউ নেই। সেরকম একটা চরিত্র তৈরি হলো। কী মনে করে জানি না তাকে আমি কবি হিসেবে আনলাম, সে কবি হতে চায়, কবিতা লেখে। রবীন্দ্রনাথের বিশাল ভক্ত সে। কাব্যে, ভাবনায় কবিতা লেখার মাঝে রবীন্দ্রনাথের ছায়া আছে।’
এই তাহলে ‘কবি কহিছেন’ এর মূল সূত্র?
‘এই মানুষটা রবীন্দ্রনাথের এতো বিশাল ভক্ত। তার নাম রবিউল ইসলাম। কিন্তু একসময় তার মনে হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে মিলিয়ে তার নাম হবে রবিউল ঠাকুর। পরে সে এটা রাখে না। এই মানুষটা ঘোরে এবং শহরের বিচিত্র মানুষের সঙ্গে তার দেখা হয়। তার বন্ধু রিকশাওয়ালা, হকার। সে দেখলো এই শহরের মানুষ খুব নিয়তিবাদী। তারা জানে না কোথায় যাবে, কী করবে! ভাবে একদিন কেউ তাদের জীবনধারা বদলে যাবে। অলৌকিক কিছু ঘটবে। হঠাৎ করেই তার জীবনটা বদলে যাবে।’
ওই যুবককে দেখার পরপরই কী আপনি লেখা শুরু করলেন?
‘‘না এটা আমার মধ্যে ঢুকেছিলো। যে যুবককে দেখেছিলাম সে কবি কিনা জানি না, কিন্তু আমার কল্পনাগুলো তার মধ্যে প্রবেশ করিয়েছি। এটা করতে গিয়ে যেটা হলো রবিউল যেহেতু রবীন্দ্রনাথের ভক্ত সে কারণে আমাকে রবীন্দ্রনাথের ওপর পড়তে হলো। অনেক কবিতা পড়তে হলো। যেহেতু সে কবিতার উদ্ধৃতি দেয়, কখনো নির্মলেন্দু গুণের কবিতা বলে, পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতা বলে। তাই নানা ঘটনা তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরও অনেক মানুষকে নিয়েই ‘কবি কহিছেন’।’’
এর আগের বইগুলো নিয়ে একটু জানতে চাচ্ছি?
‘‘আমি বেশ ঘুরি। আমার বন্ধু-বান্ধবের একটা গ্রুপ আছে। দলবেঁধে আমরা ঘোরাঘুরি করি। ভোরের কাগজের ‘পাঠক ফোরাম’ বা প্রথম আলোর ‘বন্ধুসভা’র দায়িত্বে থাকার সুবাদে প্রচুর ঘোরা হয়েছে আমার। কখনো কাজের স্বার্থে কখনো নেশার কারণে। ঘুরতে আমার ভালো লাগে, নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, সংস্কৃতি এসব আমাকে খুব টানে। তো এমন করে আমরা একবার টাঙ্গুয়ার হাওরে গেলাম। সেখানে বিশাল গ্রুপ রয়েছে যাদের সাথে ট্রলার নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। সেখানে সারাদিন বজরা ভাসিয়ে গান করি। সেটা একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তেমনি আমরা একবার গেলাম। অনেক মানুষ ছিলো সেই সময়। আমরা যাত্রা বিরতি করলাম টেকেরহাটে। ওখানে গিয়ে আমরা নীলাদ্রি লেকের পাড়ে বসলাম। দেখলাম একটা সাইনবোর্ডে লেখা ‘শহীদ সিরাজ লেক’। স্থানীয়রা সাইনবোর্ডটা লাগিয়েছেন। তারা এটাকে নীলাদ্রি লেক মানে না। কৌতূহল হলো, এই শহীদ সিরাজ কে? লোকজন বললো, পাশেই তার কবর। সেটা দেখে এলাম। পরে খোঁজ নিয়ে দেখলাম মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জের অসাধারণ ঐতিহ্য হাওরের। শহীদ জগৎজ্যোতি দাশের ‘দাশ পার্টি’। সেটা অকল্পনীয় একটা ইতিহাস। সৌভাগ্যের বিষয় ওই সময় টিমে হাসান মোরশেদ ছিলেন যিনি দাশ পার্টির ওপর বই লিখেছেন। তার সঙ্গে আলাপ শুরু করলাম। ঢাকায় ফিরে বই পড়লাম। তখন আমার মনে হলো ভ্রমণকে ভিত্তি করে একটা বই হতে পারে। জায়গা, মানুষের নামও একই হতে পারে। সেই থেকে একটি উপন্যাস লিখলাম। বিষয়বস্তু ছিলো সত্য গল্পের ছলে অনেক সিরিয়াস কথা বলে ফেলা। সেজন্য নাম দিলাম ডকু ট্রাভেলক। ‘চন্দ্রযান: দ্যা লুনাটিক এক্সপ্রেস’। ভালো দিকটা হলো লিখতে লিখতে এই ধরণটা আমার পছন্দ হলো। লিখলাম ‘সীমানা পেরিয়ে’। ওটাও ডকু ট্রাভেলক। এর আগে একটা লিখলাম ‘ডাবল ডেকার’। সেটা এ শহরকে নিয়ে।’’
আপনি নিজেই বললেন দেরিতে লেখালেখি শুরু করেছেন, এর কারণ কী?
‘সহজ কথায় বললে আলসেমি। ভারী কথায় বললে আমার নিজের মনে হয়নি যে আমি প্রস্তুত। নিজের ভেতর একটা সায় লাগতো সেটা আমি পাইনি। এই জীবনে তো প্রচুর লেখা এডিট করলাম। পাঠক ফোরাম, বন্ধুসভায় বস্তায় বস্তায় লেখা আসতো। আপনিও ছিলেন এসব সংগঠনের সাথে। আপনাকে বলি, আমি কিন্তু সব লেখাই পড়তাম। না পড়ে কোনো লেখা ফেলতাম না। এডিটিং-এ যতো স্বচ্ছন্দ ছিলাম বই প্রকাশে ততো ছিলাম না। এখন উপভোগ করছি। নিজেকে সম্পাদক হিসেবে, পাঠক হিসেবে ভালো মনে করি। যেটা ঘটে কোনো কিছু লিখতে গেলে আমি সে সম্পর্কে অনেক কিছু পড়ার চেষ্টা করি। যার কারণে আমার ধীর হয়। আমি হয়তো একটা শব্দের জন্য তিন বছর অপেক্ষা করি। যেমন- এ বইটা ধরেন, রবীন্দ্রনাথের আদিবাড়ি কিন্তু খুলনায়। উনারা ছিলেন কুশারী। কুশারী থেকে কীভাবে ঠাকুর হলেন এটা জানতে কিন্তু আমাকে পড়তে হয়েছে। আমি ফাঁকি দিতে চাইনি। লেখালেখির বিষয়ে আমি বেশ খুঁতখুঁতে। সততা, শ্রম ও নিষ্ঠা থেকে লিখতে চেষ্টা করি।’
