সমাজের অসঙ্গতির ওপর করাত চালান মোহিত কামাল

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৫:০৬

বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল তার ‘কার্তিকে বসন্ত’ উপন্যাসের মাধ্যমে আমাদের চিরায়ত গ্রাম্য সমাজের অপরাধের নির্মমতা তুলে ধরার পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করার প্রয়াস চালিয়েছেন। একইসঙ্গে কৈশোর মনের অতলে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত ভালোবাসার গোপন কুঠুরিতেও মনস্তাত্ত্বিক আলো ঢেলে দিয়েছেন এই ঔপন্যাসিক। তার সঙ্গে কথা হয় অমর একুশে বইমেলায়।

‘কার্তিকে বসন্ত’ বইয়ের বিষয়বস্তু কী?

‘‘গ্রামীণ জনপদ নিয়ে সবচেয়ে ভালো উপন্যাস আমি মনে করি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র ‘লালসালু’। সেখানে ধর্মীয় অন্ধত্ব, মাজার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তিনি খড়গহস্ত হয়েছেন। আমিও গ্রামীণ জনপদের মধ্যে ঢুকে দেখেছি প্রচুর মেয়ে বিশেষ করে যারা একটু উঠতি বয়সের হয়, শরীর দ্রুত বাড়ে তারা রাস্তাঘাটে যেতে পারে না। উত্যক্ততার শিকার হয়। নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয়। বিদেশি পাত্রের কাছে বিয়ে দিয়ে জীবন ছারখার করে দেয়। এই উপন্যাসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নানা শ্রেণীর কর্মকর্তা ও স্কুলশিক্ষকের ভূমিকা দেখানো হয়েছে, যারা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের জন্য এক হন। সেখানে মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য যে কথাগুলো বলা হয় সেগুলো হলো, ‘মেয়েরা এখন ডুবোজাহাজ চালায়। যুদ্ধবিমান চালায়, সেনাবাহিনী, র‍্যাব কিংবা পুলিশের উচ্চপদে গিয়ে এগিয়ে গেছে অনেক দূর। ইউএনও, ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসক ও সচিব হচ্ছে মেয়েরা। সব শিক্ষকতায় বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞান আর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বড় বড় অধ্যাপক পদ অর্জন করছে। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে তাদের সব সম্ভাবনার দ্বার বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়।’’

নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা কী এই উপন্যাস লিখতে ভূমিকা রেখেছে?

‘‘হ্যাঁ, যখন বিসিএস পাস করি তখন আমার পোস্টিং হয়েছে টেকনাফে। সেখানে উপজেলা প্রশাসন এর সঙ্গে ছিলাম। গ্রাম-গঞ্জে ঢুকেছি, দেখেছি মেয়েরা কীভাবে নির্যাতনে শিকার হয়। এমন বহু ঘটনা আমি পেয়েছি। এছাড়া আমার সময়ে বিয়ে প্রতিরোধ করতে এক মেয়ে তখন টেকনাফ থানার ওসির কাছে আশ্রয় নিয়েছিল ওই ঘটনাটাই আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। বাকিটা কল্পনা। এখানে ধর্মীয় ব্যখ্যাও রয়েছে। যেমন ধর্মীয়ভাবেও যদি জোর করে ‘কবুল’ শুনেছি বলে বিয়ে দেওয়া হয় সেটাও কিন্তু আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। মানুষকে সচেতন করার জন্য এই ধর্মীয় অনুশাসনের কথাও আমি বইয়ে এনেছি। ‘কার্তিকে বসন্ত’ বইটিতে ধর্মীয়, মনস্তাত্বিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ রয়েছে।’’

আপনার বেশিরভাগ বই সামাজিক সচেতনতামূলক। বইগুলোতে আপনি কী কোনো বার্তা দিতে চেয়েছেন?

‘‘মানুষ লিখেন তার ধারণা থেকে, যেকোনো বিষয়ের উপর ভিত্তি করে। সেটি আমি নিচ্ছি যাপিত জীবন থেকে। একেকটা ধারণা একেকরকম। আবার চিকিৎসক হিসেবে আমি কিছু ধারণা পাই। অসংখ্য ঘটনা আমি পেয়েছি যেমন মেয়েরা যখন শ্বশুরবাড়িতে যান সেখানে যদি তার পিরিয়ড না হয় তবে তাকে সন্দেহ করা হয়। কিন্তু বাসর রাতেও একটা মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হতে পারে। এই ঘটনার আলোকে আমি ‘অহনা’ উপন্যাসটা লিখলাম। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের হলে সেখানেও সাড়া পড়েছে। এই যে সমাজের একটি ক্ষত এটির সঙ্গে আমি চরিত্র নির্মাণ করেছি নিজের মতো করে। সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট নির্মাণ করেছি। সেলিনা হোসেন আমাকে একটা উপাধি দিয়েছেন ‘সমাজ মনস্ক কথাসাহিত্যিক’। আমি এটাকে ধারণ করি। আমি সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরি। সেগুলোর ওপর করাত চালাই।’’

এমন কোনো বইয়ের ঘটনা কী রয়েছে যেটি আপনাকে কান্নায় ভাসিয়েছে কিংবা আনন্দে ডুবিয়েছে?

‘‘কেঁদেছি। আমার একটা উপন্যাসে একটা মেয়ে সুইসাইড করে। ‘ঘর’ উপন্যাসে। প্রথমা থেকে একটি বই বেরিয়েছিল ‘সুস্মিতার বাড়ি ফেরা’। এ বইটি লিখতে গিয়েও আমি কেঁদেছি। নজরুলের জীবনীভিত্তিক কিশোর উপন্যাস আমি লিখেছি। দুখু এক, দুখু দুই এমন। দুখুর জীবনের সঙ্গে আমার জীবনের মিল রয়েছে। তার বাবা মারা গেছেন ছেলেবেলায়। পরীক্ষা দেওয়ার সময় তার বাবা মারা গেছেন। আমার বাবাও মারা গেছেন এসএসসি পরীক্ষার সময়। মানুষের বাড়িতে ছিলাম পড়ালেখার জন্য। দুখু মিয়ার এ উপন্যাস লেখার পর যখন পড়ছি আমি কেঁদে ফেলেছি। যারা দুখু পড়েছেন তারাই কেঁদেছেন। কার্তিকে বসন্ত উপন্যাসেও কিছু কিছু ঘটনা মনকে নাড়া দিয়েছে। এ উপন্যাসে দুর্দশার মধ্যে যেন বসন্তের আলো দেখতে পাবেন। আলোকিত জীবনের সন্ধান পাবেন। কার্তিক মানে তো মঙ্গার সময়। মলিন মাস। সেই কার্তিকেও আমরা বসন্তের আলো দেখতে পাবো। মানুষের জীবনেও নানা দুর্দশা, ক্ষত, দুশ্চিন্তা ও অবিচারের মুখোমুখি হতে হয়। তারা আবার সেটাকে জয় করে আলোর মুখ দেখে। বসন্তের বাতাস আবার তাদের ভরিয়ে দেয়।’’

কার্তিকে বসন্ত উপন্যাসের ফ্ল্যাপে লেখা হয়েছে, ঋতু বৈচিত্র্যে কার্তিক মরা মাস হলেও চন্দা দেখছে বসন্তের রঙিন প্রকৃতি। পাঠকও দেখার সুযোগ পাবেন মনপুর বালিকা বিদ্যালয়ের তেজোদ্দীপ্ত সখীদের সঙ্গে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া চন্দার লড়াকু নেতৃত্বের আসনে উন্নীত হওয়ার আখ্যান। আরও দেখতে পাবেন প্রতিবন্ধী ক্ষমতাধর উত্ত্যক্তকারীর কুৎসা রটানোর দমবন্ধ করা ঘটনা ইর্ষা, নিষ্ঠুরতা ও কুটিলতার বয়ান।

ইত্তেফাক/এসকে