কন্টকাকীর্ণ প্রবাসজীবনের গল্প ‘হৃদয় এক অমীমাংসিত জলছবি’

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৫:১১

অধিকাংশ মানুষই হৃদয়ের ইচ্ছেগুলো লুকিয়ে রেখে একবুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে প্রস্থান করে পৃথিবী হতে। পরিবার, সমাজ, দেশের বেঁধে দেওয়া নিয়মে হৃদয়ের ইচ্ছেগুলোকে তুচ্ছ করে তারা বনে যায় মহাকালের গতানুগতিক রাখাল। কেউ কেউ হৃদয়ের কথা শুনে যখন ইচ্ছেগুলো ছুঁয়ে দিতে যায় তখন চারপাশে উঁচু উঁচু প্রাচীর দেখতে পায়। বহু চেষ্টা করেও এত উঁচু প্রাচীর উজিয়ে এক জীবনে তাঁদের আর ইচ্ছেগুলো ছোঁয়া হয় না। সেইসব আশাহত হৃদয়ের কিছু টুকরো টুকরো ছবি পলি শাহীনা এঁকেছেন তার ‘হৃদয় এক অমীমাংসিত জলছবি’ বইটিতে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসে গল্পের হাহাকারের গল্প শুনিয়েছেন এই প্রবাসী লেখক।

দীর্ঘদিন পর আপনার নতুন বই? কোন বিষয় স্থান পেয়েছে?

‘হৃদয় এক অমীমাংসিত জলছবি’ একটি গল্পগন্থ। এই বইয়ে ১৬টি গল্প রয়েছে এর মধ্যে ১৪টি গল্পই প্রবাস জীবনের আরশি থেকে নেওয়া। প্রবাস জীবন যাপন থেকে নেওয়া। আর দুটি গল্পের একটি ভাষা আন্দোলন আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের।

বইয়ে গল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে, অন্তর্দহন, একলা দ্বীপের চিঠি, চৌখুপরি আনন্দ, ক্ষুধার টান, দহন পথে, গভীর জলের কান্না, হৃদয় এক অমীমাংসিত জলছবি, গোল্ডফিশের স্বপ্ন, ঝরাপাতা, তোরঙ্গ বন্দি গল্প, বিভ্রম।

এই গল্পগুলোর প্রেক্ষাপট কী বলবেন?

‘‘প্রথম গল্পটি নিয়ে যদি বলি ‘অন্তদর্হন’। এই গল্পটি করোনাকালের। করোনা যখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে নিউইয়র্ক শহরকে তখন বলা হচ্ছিল করোনার ‘এপি সেন্টার’। চায়নার পর নিউইয়র্কে। সেখানে প্রথম রাস্তার ওপর লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি। তখন আমার এক বন্ধুর স্বামী মারা যান। আমার সেই বন্ধুর হাহাকার থেকে এই গল্পের উৎপত্তি। কারণ তাদের ভালোবাসার সময়টা আমি জানতাম। ‘একলা দ্বীপের চিঠি’ এটি আমি এক দম্পত্তিকে জানি, সাংস্কৃতিক পার্থক্য কীভাবে দাম্পত্য জীবনকে বিষিয়ে তুলে সেটি এই গল্পে রয়েছে। ২৩ বছর ধরে আমি যেহেতু বিদেশে রয়েছি সেই কারণে অভিবাসী জীবনটা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। ওখানকার যাপিত জীবন আমার গল্পে উঠে এসেছে। বিশেষ করে যারা স্পাউস ভিসায় আমেরিকায় যান। (এখন অবশ্য বদলেছে) আমেরিকান সিটিজেন দেখে বাবা মায়েরা যাচাই বাছাই না করেই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিত।

‘‘ছেলেদের বেলায়ও দেখেছি। শিল্পের ছাপ নেই কিন্তু আমেরিকার ছেলে বা মেয়ে দেখে বিয়ে করে ফেলছে। ছেলেদের অন্তদর্হন আমি দেখেছি আর মেয়েদেরটা একেবারে অহরহ। ‘চৌখুপির আনন্দ’ এই গল্পের যিনি কথক তিনি বেলী ফুল ভালোবাসতেন। কিন্তু তিনি বিদেশে গিয়ে বেলী ফুলের মধ্যে বাংলাদেশের ফুলের ঘ্রাণ পাচ্ছেন না। পরে উনি বেলী ফুলের গাছে এনে লাগিয়েছেন সেখানে ফুল ফোটার পর তার যে আনন্দ সেটাই এই গল্পের মূল। যেমন ক্ষুধার টান গল্পটি প্রবাসী এক আফ্রিকানের জীবনের টানাপোড়নের গল্প। দহন পথেও বিদেশে এক দম্পতির বাচ্চা না হওয়া নিয়ে নানা সমস্যার গল্প। এমন সব গল্প। ‘হৃদয় এক অমীমাংসিত জলছবি’ যেটির নামে বইয়ের নাম সেটি মূলত বিদেশ থেকে দেশে ফেরা এক মানুষের গল্প যে কিনা দেশে ফেরার পর আবার অনুভব করে বিদেশে সন্তানের জন্য মন খারাপ হয়, ভাবে এ কোন দোটানা। তার মনে হয় শরীর ফুঁড়ে বুঝি প্রবাসের গন্ধটাই বেরিয়ে আসছে।’’

এই গল্পগুলো লিখতে কতো সময় নিয়েছেন?

‘এগুলো দুই/তিন বছরে লেখা। এই গল্পগুলো লেখার অর্থ হচ্ছে আমি যখন দেশে আসি অনেকেই বলেন বিদেশ মানেই অনেক শান্তির, অনেক সুখের। আবার অনেকে বিদেশে যেতে চান। অনেকে জেনে না জেনে ছেলে-মেয়েকে বিয়ে করান। আমি এই গল্পগুলো লিখেছি আগামীতে বাবা মায়েরা যেন বিদেশে (বিশেষ করে আমেরিকা) বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে চিন্তা করেন। আমেরিকার কথা এ জন্য বলছি এমন পাত্র-পাত্রী পেলে বাবা মায়েরা মতামতের উপেক্ষা করে, অনেক সময় জোর-জবরদস্তি করে তাদের বিয়ে দিয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে আমার গল্পগুলো পড়ে যেন বাবা মায়েরা সতর্ক হয় বিদেশে ছেলে-মেয়েদের পাঠাতে বা বিয়ে দিতে। সেখানকার জীবন উনারা যতোটা ভাবছেন ততোটা কুসুমাস্তীর্ণ না অনেকটা কন্টকাকীর্ণ।’

লেখালেখির বয়স কতো হলো?

‘প্রথম আমি স্বরচিত কবিতা পড়ি সপ্তম শ্রেণিতে একুশে ফেব্রুয়ারিতে। লেখালেখিতে কেমন করে এলাম ঠিক জানি না। তবে আমি আমার বাবাকে প্রচুর চিঠি লিখতাম। ডায়েরি লিখতাম। বাবা প্রচুর বই পড়তেন। কবিতা শুনতাম। সিরিয়াস যদি লেখালেখির কথা বলেন, তাহলে সেটা ২০১৪ সালের দিকে। আমার বাবা-মা কাছাকাছি সময়ে মারা যান। ওই সময়টা আমার অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করতো কিন্তু আমি বলতে পারতাম না। তখন লিখতাম। লিখতে লিখতে একটা সময় মনে হলো আমি লিখতে পারছি।’

ইত্তেফাক/এসকে