ভাষার মাস চলছে। আমাদের মধ্যে ভাষার প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন আর ভাষা আন্দোলনের চেতনা এখন খুবই জাগ্রত। তবে বছরের অন্যান্য সময়গুলো আমাদের মাতৃভাষার প্রতি এতো ভালোবাসা দেখা যায় না। তাছাড়া যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে আমরা আমাদের শিশুদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াচ্ছি। আবার বিনোদনের প্রয়োজনে আমরা কোরিয়ান, পশতু, স্প্যানিশ, হিন্দি উর্দু অনেক ভাষাই শিখছি। এগুলোর মধ্যে কোনো কোনো ভাষা আমাদের জীবনে কাজে লাগে, এজন্য এসব ভাষার ব্যবহারও বেড়ে গেছে। যারা ব্যক্তি জীবনে বাংলা ছাড়া অন্যান্য ভাষা ব্যবহার করে তারা কথা বলা ও চলনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে অনেক মিশ্রণ করে ফেলে।
গত ৭০ বছরে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির যে পরিমাণ পরিবর্তন হয়েছে অন্য কোনো ভাষা বা সংস্কৃতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। বছরের এই কয়েকটা দিন আমরা খুব সচেতনতার সাথে ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে চিন্তা করি। সন্তানকে ইংরেজিতে ভালো দক্ষতা সৃষ্টির জন্য তাকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে দেওয়া হয়। তাকে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। তাই প্রতিটি বাবা-মায়ের চাওয়া থাকে তার সন্তান যেন বাংলা ভাষাটাও সুন্দরভাবে আয়ত্ত করে ফেলে এবং তার চর্চা করে।
এখন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া শিশুদের বাংলা ভাষা চর্চা করানো একটু কষ্টসাধ্য কাজই। কিভাবে এই কঠিন কাজটি করবেন তাই নিয়ে অনেক বাবা-মায়ের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ছে। আবার অনেকে বিষয়টি এড়িয়ে বাঁচতে চাইছে। কিন্তু মূল কথা হচ্ছে এই বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। অন্যান্য ভাষার দক্ষতা যেমন একটা যোগ্যতা বলে পরিগণিত হয় তেমনি সুন্দরভাবে বাংলা ভাষা জানাও এক ধরনের দক্ষতা। কিভাবে সন্তানকে মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহী করে তুলবেন তাই নিয়ে কিছু কথা বলা যাক—
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা অনুযায়ী আগে নিজের ভাষায় দক্ষ হও, পরে বিদেশি ভাষার চর্চা করো। সুতরাং শিশুরা যখন একদম ছোট থাকে তখন তাদেরকে নিজের ভাষা শেখানোর প্রয়াস নিতে হবে। শিশুর কথা শুনে রেসপন্স করার বয়স থেকে নিজেদের মধ্যে সুন্দর করে বাংলা ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করতে হবে। এতে শিশু অবচেতন মনেই এ ভাষা শিখে যাবে।
শুধু নিজেদের মধ্যে কথা সুন্দরভাবে বলেই ঘটনা শেষ নয়। এখন আধুনিক যুগ, শিশু বাবা-মায়ের মুখে কথা শোনার আগেই টিভি, মোবাইল এসব দেখা শুরু করে। আর এসব ডিভাইস থেকে বিভিন্ন ধরনের ভাষা শিখে ফেলে। এক সময় ডোরেমন নামে একটা কার্টুন খুব প্রচলিত ছিল, যার মূল ভাষা ছিল জাপানি। শিশুরা ডোরেমন দেখতে দেখতে জাপানি ভাষাও শিখে ফেলেছিল। সুতরাং ডিভাইসের ওপর কন্ট্রোল আনতে হবে। আর বিভিন্ন ধরনের ভাষার চেয়ে নিজের ভাষার অনুষ্ঠান দেখাতে চেষ্টা করতে হবে।
শিশুরা দেখে শিখে। বাংলা একটা চ্যানেল সৌমিত্র শেখর ও আনিসুল হককে নিয়ে ‘বাংলা ভাষায় মুন্সিয়ানা’ শিরোনামে একটা অনুষ্ঠান করেন। আমি আমার বাসার শিশুদের নিয়ে এই অনুষ্ঠানটা দেখি সবসময়। উদ্দেশ্য আমার ভাগ্নে বা ভাগ্নিরা ওনাদেরকে দেখে বুঝতে শিখুক বাংলা ভাষায় দক্ষ মানুষও সুন্দর আর স্মার্ট হয়। ওনাদের ব্যক্তিত্বের কিছু প্রভাব তো ওদের ওপর পড়বে।
আমি খুব ছোট ছিলাম যখন আহমেদ ছফার ‘যদ্যিপ আমার গুরু’ বইটা পড়েছি। সেই বইয়ে আবদুর রাজ্জাক স্যারের অনেক কথা কোটেশন আকারে আছে যেখানে দেখা গেছে লেখকের গুরু এবং লেখক দুজনই আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছে এবং তাদের মনে এটা নিয়ে সংকোচ নেই। এই যে নিজের ভাষার আঞ্চলিকতা নিয়ে সংকোচ— এটা শিশুদের মধ্য থেকে দূর করতে হবে।
শিশুদের নতুন কিছু শেখানোর ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ের নেতিবাচক দিক বলে তাকে সেই বিষয় থেকে বিরত করা যায় না। শিশু ইংরেজি বা অন্য ভাষা শিখে ফেলছে এটা তাকে ভুলিয়ে দেওয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এই ভাষার খারাপ দিকগুলো বলেও তাকে এ ভাষা শিক্ষা থেকে দূরে রাখতে পারবেন না। ফলাফল উল্টো হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। সুতরাং তার কাছে অন্য ভাষা খারাপ কি ভালো এসব আলোচনায় না গিয়ে আমাদের ভাষার যে সুন্দর দিকগুলো আছে সেগুলো তুলে ধরা ভালো। এতে তারা শিখতে আগ্রহী হবে।
বাংলা ভাষায় লেখা বই ম্যাগাজিন পড়ে শোনাতে হবে। আমাদের ভাষার সাহিত্য সংস্কৃতির অংশ গল্প আকারে বলতে হবে।
ইংরেজি মাধ্যমের বইগুলো পড়ানোর সময় তার বাংলা অর্থ বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করতে হবে, যাতে তার ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাও শেখা হয়ে যায়।
অন্যদের সাথে ভাব বিনিময়ের ক্ষেত্রে যেন বাংলা ভাষার ব্যবহার করে। আর যারা কুশল বিনিময়ে বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে লজ্জাবোধ করে তাদেরকেও বুঝিয়ে বলতে হবে।
বাংলা একাডেমি অনেক কবিতা আবৃত্তি ও ভাষা শিক্ষা কর্মশালা আয়োজন করে এমন কোনো অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এতে ভাষার সৌন্দর্য সম্পর্কে ধারণা পাবে।
আজকাল বাসাগুলোতে সারাক্ষণ হিন্দি সিরিয়াল চলতে থাকে। ফলে শিশু ও তার পরিবারের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে হিন্দিতে কথা বলে। এ জাতীয় সমস্যা থাকলে প্রথমে বাসার সমস্যা সমাধান করতে হবে।
নিজের ভাষা শিখছে এবং এতে তারই উপকার এটা তাকে মুখে বলে না বুঝিয়ে তাকে বিভিন্ন উপহার দিয়ে উত্সাহিত করা যায়। একটু বুদ্ধি খাটিয়ে উপহারটিও যদি দেওয়া যায় বাংলা গল্পের বই তাহলে আপনার কাজ ষোলআনা সম্পন্ন।
বিদেশি ভাষার ব্যবহার করা স্মার্টনেস— শিশুদের মন থেকে এ ধারণা দূর করতে হবে। নিজের ভাষাকে শুদ্ধ ও সুন্দরভাবে ব্যবহার করা সবচেয়ে বড় স্মার্টনেস— এটা বোঝাতে হবে কৌশলে।
আমরা সহজেই অন্য ভাষাকে উদ্বাহু হয়ে আগলে নিই। যে কারণে এমনিতেই আমাদের ভাষা অনেক ভাষার মিশ্রণ হয়ে আছে। তবুও যতটুকু স্বকীয়তা আর সৌন্দর্য রয়েছে তাও বর্তমানে ভাষা শিক্ষার হিড়িকে হারাতে বসেছে। ইংরেজি ভাষা বা অন্যান্য ভাষা জীবনের প্রয়োজনে তো শিখতেই হবে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের অধিকাংশ ধাপের বই ইংরেজিতে আর অন্য ভাষার বইও ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয় সবার বোধগম্য হওয়ার জন্য; তাই কোনো অভিভাবক যদি তার সন্তানের ভবিষ্যতের পথ সহজ করার জন্য ইংরেজি মাধ্যমে শিশুকে পড়াতে চায় এটা তাদের দোষ নয়। তবে শিশুকে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য ভাষা শিক্ষা নয়। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে কাজ করলেই শিশুর ভাষা বিষয়ক সমস্যার সমাধান হবে।

স্ক্রিনের ওপারে ভাবলেশহীন ভালোবাসা
বইমেলায় সারাদিন যেভাবে কাটাবেন
পোষা পাখির যত্নে