নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি ধরা পড়ে ‌‘অন্তরালে’

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৩, ১১:৩৭

লেখক হিসাবে পুরাতন হলেও ঔপন্যাসিক হিসাবে লিপি ইয়াছমিন নতুন। কারণ 'অন্তরালে' তার ডেবু উপন্যাস। 'অন্তরালে' এর অন্তরালে একজন পরিপক্ক লেখকের মত প্রখর মেধার সাক্ষ্য রেখেছেন তিনি। বইটিতে পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর প্রতি পুরুষের অবহেলা, নির্যাতন ও অবিচার তুলে ধরা হয়েছে। নারীবাদী এ লেখিকা বলতে চেয়েছেন যে পুরুষের আচারণ নারীকে তার অস্তিত্বের সংগ্রামের পথে ধাবিত করে। বইটি পড়লে একজন নারী তার নিজস্ব বুদ্ধি ও মনন দ্বারা সকল বাঁধা অতিক্রম করার সমাধান খুঁজে পান। সে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখে।

মিনু রহমান উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। গোটা পান্ডুলিপিতে পুরুষ চরিত্রের উপস্থিত নাই বললে চলে। কারণ, লেখিকা আত্ম-চরিত চরিত্র মিনুর মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন "নারী তার ভাগ্য নিয়ে সংসারে প্রবেশ করে"। তিনি বিশ্বাস করেন, এ প্রচলিত  প্রথা ভেঙে নারী নিজেই সৌভাগ্য আনতে পারে।

মিনু সংগ্রামীচেতা নারী। তার বিয়ে হয় একজন অধিবেত্তার সাথে। সে রাতেই তার নারীত্বের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়। পুরুষদের প্রতি ঘৃণা জন্মে। বিবাহ নামক তথাকথিত সমাজ স্বীকৃতিকে সে ধিক্কার জানায়। দুইযুগেরও অধিক সময় ধরে সে জীবন-সংগ্রামে লিপ্ত থাকে। অনেক নর-নারীর সান্নিধ্যে তিনি আসেন। যৌবনের প্রথম প্রহরে সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি দেখেন। ফলে দাম্পত্য জীবনের সুখ তার সামনে কাঁচ-ঘেরা বোতলে থাকে। প্যারাডক্সিক্যাল পরিবেশে জীবনের অমৃতস্বাদ পেতে সে ফিরে যায় পূর্বস্মৃতির পাতায়। ভুক্তভোগীদের কাছে এই জায়গা বড় নির্মম। সৃষ্ট সমস্যা সমাধান খুজঁতে মিনু। ছিলো তৎপর মিনু রহমান তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝিয়েছে প্রতিটি নারী পুরুষ সতন্ত্র। সততা ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে তিনি কোন আপোষ করেননি মিনু। মিনু কেন্দ্রিক গোটা কাহিনী হওয়ায় উপন্যাসটির দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও মিনুর সতীত্ব রক্ষায় দীর্ঘদিনের সংগ্রাম পাঠকদের আকর্ষণ করেছে। তার চরিত্র এভাবে উপাস্থাপন করা লেখিকার অনন্য বৈশিষ্ট্য।

উপন্যাসটি নাতিদীর্ঘ হলেও ঘটনাবহুল। প্রতিটি ঘটনার সাথে আছে একজন নারী জড়িত। বিবাহিত জীবনের বীতশ্রদ্ধা মিনুকে এসব নারীদের কাছে আসতে শিখিয়েছে। তাদের সমস্যা সমাধানে তিনি তৎপর হয়েছেন। লেখিকা বুঝাতে চেয়েছেন বাংলার সমাজ দর্পণে প্রেম ও বিবাহ ভিন্ন গাতিতে অসমান্তরালে চলে। গতির ধারক পুরুষ। এ কারণে এ উপন্যাস বাস্তব জীবনের সাদা-কালো কাহিনীর রঙীন ছবি।

উপন্যাসটি ডাইগ্রেশনে ভরপূর। এসব উপকাহিনী প্রধান কাহিনীর সাথে অপূর্ব মিল আছে। তাই মিনু রহমানের ভাড়াটেরা তার নিসংঙ্গতা শুধু দূর করেনি বরং কাছে থেকে সমাজকে নিরীক্ষণ করা সুযোগ করে দিয়েছে। ২৪টি ছোট ছোট অধ্যায়ে উপন্যাসটি গাঁথা। একটার সাথে অন্যটি পারস্পারিক মিল বিদ্যমান। উপন্যাসটি বিফ্লেক্টিভ মুডে লেখা। আয়নার দর্পনে মিনুর ফেলা আসা ২৮টি বছরের জীবন কাহিনী বিশ্লেষণ করতে লেখিকার আত্মজীবনে নাড়া দেয় নাতো। উপন্যাসটি যেখানে শুরু প্রায় সেখানেই শেষ কিন্ত পাঠক ভেতরের পাতায় যতই প্রবেশ করবে ততই নতুন নতুন কাহিনীর সাথে পরিচিত হবে। ফলে মনে হবে এক বসায়ই ৮৮ পৃষ্ঠা পড়া শেষ হবে। সহজ ভাষার মধ্যে তীক্ষ্ম বিশ্লেষণ খুঁজে পাওয়া যায়। মিনু রহমান একজন সচেতন, লেখিকা, পড়ুয়া, প্রতিবাদী নারী যিনি যা উপন্যাসিকের মননের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। লেখকের আত্মজীবনের আত্ম-চরিত্র বর্ণনায় অনেকখানি সাফল্য।

নারীবাদী লেখা হলেও কাহিনীর উৎপত্তি পুরুষ শাসন থেকে। শিক্ষক, সমাজসেবক অথবা লেখক হিসাবে এ শাসনের বিরুদ্ধে মিনু রহমান কখনো নীরবে আবার কখন সরবে ২৮টা বছর প্রতিবাদ করেছেন। স্বল্প সময়ের জন্য একজন পুুরুষের মন পেলেও অবাঞ্চিত সম্পর্কের কারণে তার অচিরেই সম্বিৎ আসে এবং তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।
 
উপন্যাসটির কাহিনী বিন্যাস নিয়ে এতটুকু বিভ্রান্তের অবকাশ নেই। মিনু রহমানের নিজ বাড়ি ও শ^শুড়ালয় সমগোত্রীয় ভৌগলিক রেখায় অবস্থিত। লেখিকা কিছু নতুন শব্দ চয়ন করেছেন। ক্রিয়া পদের ব্যবহার ছাড়া সৌন্দয্যপূর্ণ বাংলা বাক্যের উপহার দিয়েছেন। বানান, ব্যাকরণ, বিরাম চিহ্নে যৎসামান্য মুদ্রণ ক্রুটি থাকা সত্বেও প্রথম উপন্যাস হিসাবে এটা যথেষ্ট পাঠযোগ্য। তবে নতুন শব্দগুচ্ছ, ছোট সংলাপ বা কথ্য আলাপ যা পাঠকেরা তোতার মত আওড়ানোর কথা সেগুলোর অপ্রতুলতা বিদ্যমান।  

বড় লেখকদের সাদামাটা সামাজিক ঘটনা নিজস্ব স্টাইলে উপস্থাপনের কারণে পাঠকদের অধিকতর পাঠযোগ্য হয়। 'অন্তরালে' পড়লে মনে হবে এ কাহিনী আমাদের জানা। তবে কাহিনীটা এভাবে সাজানো হয়েছে, এক অধ্যায় পাঠ শেষ না হতেই আরেকটা পড়তে মন চাইবে। এ কারণে উপন্যাসটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গৃহিনী, ব্যবসায়ী সকল শ্রেণির পাঠকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। পাঠকেরা নারী জীবনের সুপ্ত বাসনার কথা জানতে চায়। সেজন্য বইটি পড়লে নারীর প্রতি পুরুষ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি সহজে ধরা পড়ে। 

কাহিনীর বেড়াজালে পাঠকদের বাঁধতে চায় সব লেখকরা । নতুন লেখক হিসাবে সমাজের সাধারণ মানুষের চরিত্র রুপায়ন করা কঠিন কাজ। বইটিন মান বিবেচনা করে আগামী বইমেলা শুরুর আগে লেখিকার কাছ থেকে অন্য কোন সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে আরেকটি মানসম্মত উপন্যাস পাঠকেরা আশা করতে পারে। তাই নয়কি?

ইত্তেফাক/কেকে