ক্রিকেট স্টেডিয়াম নিয়ে অপরিণামদর্শিতা কাম্য নয়

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৩, ০৩:৩২

দুঃসময়ের মধ্যেও কিছু কিছু ঘটনা থাকে, যা স্থান-কাল বিবেচনায় সৌভাগ্যের নিশানা হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ক্রিকেটও এমনই একটা নিশানা পেয়েছিল ২০০৬ সালে। দেশের ক্রিকেট তখনো বহির্বিশ্বে এতটা সুনাম কুড়ায়নি। নিভু নিভু জ্বলতে থাকা ক্রিকেট-মশাল হঠাৎ প্রাণ ফিরে পায় বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে। সে সময় শ্রীলঙ্কার মতো ক্রিকেট পরাশক্তিকে হারিয়ে বাংলাদেশ দল তাক লাগিয়ে দেয় বিশ্বকে। আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের স্বীকৃতির পর মোট পাঁচটি ওয়ানডে ম্যাচের আয়োজন করা হয় এই স্টেডিয়ামে, যার চারটিতেই জিতে যায় বাংলাদেশ টাইগাররা। স্টেডিয়ামটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য আশীর্বাদ। অথচ ১৬ বছর ধরে সেই মাঠে জ্বলছে না ফ্লাডলাইটের আলো! ক্রিকেটাররা আপন করে নিলেও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কাছে এই স্টেডিয়াম যেন ‘দূরসম্পর্কের আত্মীয়’! শেষমেশ ধুঁকতে থাকা স্টেডিয়ামের গলা চেপে ধরল বিসিবি। গেল ২ মার্চ স্টেডিয়ামটি থেকে  কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নিয়েছে বিসিবি। কী অদ্ভুত কথা! ক্রিকেটে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেছি। বিশ্বে বাংলার টাইগারদের অবস্থান এখন অনেক বেশি শক্ত। বিসিবির তহবিলও কানায় কানায় পূর্ণ—এমনকি উপচে পড়ছে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম নিয়ে বিসিবির এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত কেন? এসব কীসের আলামত?

বিসিবি সূত্রে জানা যায়, বগুড়া জেলা ক্রিড়া সংস্থার অসহযোগিতামূলক আচরণের কারণে শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম থেকে কর্মকর্তা ও কার্যক্রম পরিহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই যুক্তি কি আদৌ গ্রহণযোগ্য হতে পারে? জেলা ক্রিড়া সংস্থা বিসিবির এই সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করে জানিয়েছে, বোর্ডের সঙ্গে কোনো ধরনের অসহযোগিতামূলক আচরণের নজির নেই, থাকা সম্ভব নয়।

ভুলে গেলে চলবে না, বিসিবি হলো দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক। জেলা ক্রিড়া সংস্থার সঙ্গে বিরোধ থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানসম্মত স্টেডিয়াম থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়াটা সম্পূর্ণ অপরিণামদর্শিতা। যদিও খেলার আয়োজন না থাকায় আইসিসির আন্তর্জাতিক মাঠের তালিকা থেকে অনেক আগেই বাদ পড়েছে স্টেডিয়ামটি। তবে এই মাঠের উইকেট ও অবকাঠামো বিভিন্ন সময়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে দেশ-বিদেশের ক্রিকেটার ও বিশেষজ্ঞদের কাছে। এই স্টেডিয়ামে আছে টাইগারদের বিজয়গাথাও।

শুধু দেশীয় খেলোয়াড় ও বিশেষজ্ঞ মহল নয়, কিংবদন্তি ক্রিকেটার ক্লাইভ লয়েড স্টেডিয়াম নির্মাণের শুরুতে এসে বলেছিলেন, ‘এটি বাংলাদেশের সেরা স্টেডিয়াম হবে।’ শুধু তাই নয়, স্টেডিয়ামটির রয়েছে পাকিস্তান দলের অধিনায়ক ওয়াসিম আকরাম, শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে, কুমার সাঙ্গাকারার মতো কিংবদন্তি ক্রিকেটারদের প্রশংসাবাণী। এত ভালো প্রতিক্রিয়া বোধ হয় দেশের আর কোনো স্টেডিয়ামের নেই! অথচ শুরু থেকেই অবহেলার সবটুকুই কেবল বিসিবির তরফ থেকে! উত্তরবঙ্গের একমাত্র আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম নিয়ে বিসিবির এমন আচরণের পেছনের রহস্য কারো জানা নেই। যদিও নানা কথা ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।

বগুড়ায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনে বিসিবি প্রতিবন্ধকতার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে আবাসন সমস্যার বিষয়টি। অথচ বগুড়াতেই গড়ে উঠেছে উত্তরবঙ্গের স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক মানের বেশ কয়েকটি হোটেল।

মনে রাখতে হবে, শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা মানে দেশের ক্রিকেটকে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির মুখে ফেলে দেওয়া। কেননা, এই স্টেডিয়াম যেমন দেশের ক্রিকেটে বিপ্লব এনেছে, তেমনি তৈরি করেছে সম্ভাবনাময় বহু মুখ। মুশফিক-শফিউলদের কথা না হয় বাদ দিলাম, তরুণ ক্রিকেটার তৌহিদ হৃদয়, তামিম, খাদিজাতুল কোবরা, শারমিন সুলতানা, ঋতু মণিসহ অসংখ্য প্রতিভাবান ক্রিকেটার তৈরির পেছনে এই স্টেডিয়ামের ভূমিকা কোনোভাবেই বিস্মৃত হওয়ার নয়।

বিশ্বায়নের যুগে ক্রীড়াক্ষেত্রে সফল হতে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ব্যয় করছে। আমাদের দেশেও যে ব্যয় করা হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। কিন্তু ব্যয়িত অর্থের অপচয় হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কেননা, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া ও খুলনা স্টেডিয়ামের বেহাল অবস্থার দায় বিসিবি এড়াতে পারে না। অথচ পুরাতন এই স্টেডিয়ামগুলো সংস্কার না করে নতুন স্টেডিয়াম তৈরির সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্টদের পেশাদারিত্বের সংকটকে সামনে এনে বিসিবিকে যে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে না, কে বলতে পারে!

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন