তাত্ত্বিকভাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগদান কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কোনো কোনো সময় হয়তো দুই-একটি বিচ্ছিন্ন খাতে এই সুযোগ দেওয়া যেতে পারে; কিন্তু সামগ্রিকভাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগদানের বিষয়টি কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। আমাদের দেশে কালোটাকা সাদা করার সুযোগদানের ঘটনা নতুন নয়। বহুদিন ধরেই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অনেক সময় এমনও বলা হয়, এবারের মতো কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলো ভবিষ্যতে আর এই সুযোগ দেওয়া হবে না। কিন্তু দেখা যায়, পরবর্তী বছর আবারও কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, সরকার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিলেও খুব বেশি পরিমাণ কালোটাকা সাদা হচ্ছে না। কালোটাকার মালিকরা ভয় পান, যদি কালোটাকার খবর একবার কোনোভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে, তাহলে আজ হোক বা কাল হোক এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আর সেই অবস্থায় তারা বিপদে পড়তে পারেন। তাই তারা সুযোগ দিলেও তাদের কালোটাকার তথ্য প্রকাশ বা সাদা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন না। প্রশ্ন হলো, আমরা যাকে কালোটাকা বলি, তা কি সবই অবৈধ পথে উপার্জিত আয়? আসলে কালোটাকার সবই অবৈধভাবে উপার্জিত আয় থেকে সৃষ্ট নয়। বাংলাদেশের একটি সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে, ট্যাক্স না দেওয়া বা সুযোগ পেলেই ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া। আমাদের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও হচ্ছে মাত্র ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অথচ নেপালের মতো দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ২৩ শতাংশের মতো। আপনি যদি লক্ষ করেন, তাহলে দেখবেন, বাংলাদেশে টিআইএনধারী লোকের সংখ্যা কত কম। যারা টিআইএনধারী তাদের মধ্যেও সবাই রিটার্ন দাখিল করেন না। ট্যাক্স নেটওয়ার্কে যে টাকা আসে না, সেটাই কালোটাকায় পরিণত হয়। কীভাবে জনগণকে ট্যাক্স প্রদানের জন্য আগ্রহী বা উত্সাহিত করে তোলা যায়, তা নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। ট্যাক্স প্রদানের সামর্থ্যবান ব্যক্তিকে কীভাবে ট্যাক্স প্রদানের জন্য আগ্রহী করে তোলা যায়, সে ব্যাপারে আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে। যারা ট্যাক্স প্রদানের সামর্থ্য রাখেন, তারা যদি স্বেচ্ছায় ট্যাক্স প্রদান করেন, তাহলে দেশে কালোটাকার হার অনেকটাই কমে যাবে। সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ট্যাক্স নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। এজন্য লোকজনকে সজাগ করতে হবে। মোটিভেট করতে হবে। আমাদের দেশে বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তার অনেকেই সঠিকভাবে ট্যাক্স প্রদান করেন না। অনেকে কম ট্যাক্স প্রদান করেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত গবেষণা করতে হবে, কী কারণে মানুষের মধ্যে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা দিনদিন বাড়ছে। কেন সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা ট্যাক্স দিচ্ছেন না। এর কারণ অনুসন্ধান করে বের করতে পারলে তা সমাধান করা সহজ হবে। একজন শিল্পোদ্যোক্তার কম মুনাফা হচ্ছে বলে তারা ট্যাক্স কম দিচ্ছেন, নাকি তারা লোভের কারণে ট্যাক্স কম দিতে চান, এটা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হতে পারে। অনেকেই ইচ্ছে করেই কালোটাকা সৃষ্টি করছেন। আমাদের দেশের ট্যাক্স প্রদান পদ্ধতিও বেশ জটিল। অনেকে মনে করেন, ট্যাক্স প্রদান নিয়ে জটিলতায় যাওয়ার কোনো দরকার নেই। তার চেয়ে আমি ট্যাক্স দিলামই না। যেহেতু ট্যাক্স প্রদান না করলেও তেমন কোনো অসুবিধা হয় না, তাই তারা ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন। উন্নত দেশগুলোতে কালোটাকা নিয়ে আমাদের মতো এত সমস্যা হয় না। তারা অর্থোপার্জন করছে। সেই উপার্জিত অর্থের ওপর নির্ধারিত হারে ট্যাক্স প্রদান করছে। কিন্তু আমাদের দেশে এমনটি হচ্ছে না।
কালোটাকা সৃষ্টির পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে সর্বস্তরে বিদ্যমান ব্যাপক দুর্নীতি। কালোটাকা বন্ধ করতে হলে আমাদের দুর্নীতির মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। আমাদের দেশের প্রশাসনব্যবস্থা এবং এর কর্মসংস্কৃতি এমনভাবে গড়ে উঠেছে যাতে এখানে দুর্নীতির জন্ম নেয়। বৈধভাবে আপনি যদি কোনো কাজ করতে যান তাহলে দেখবেন কত ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অবৈধভাবে টাকা দিয়ে কোনো কাজ করাতে চাইলে তা খুব সহজেই হয়ে যায়। এসব বিষয় আমাদের অ্যাড্রেস করতে হবে। সবকিছু ডিজিটাইলজ করা গেলে দুর্নীতি অনেকটাই কমে আসবে বলে আমার বিশ্বাস। ১/১১-র পরে যখন মানি লন্ডারিং আইন প্রণয়ন করা হয়, তখন বলা হয়েছিল, অবৈধভাবে অর্জিত আয় যদি কোনো অবাঞ্ছিত পথে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তাকে মানি লন্ডারিং বলা হবে। পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, মানি লন্ডারিংয়ের সংজ্ঞাটা পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, বৈধ বা অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ যদি খারাপ পথে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তাকে মানি লন্ডারিং বলা হবে। যেমন কেউ বৈধ পথে অর্থ উপার্জন করলেন; কিন্তু ট্যাক্স দিলেন না, তাহলে সেটা মানি লন্ডারিংয়ের পর্যায়ে পড়বে। আমি ব্যক্তিগতভাবে কালোটাকা আর অপ্রদর্শিত অর্থের মতো কোনো পার্থক্য করতে রাজি নই। কারণ কেউ যদি তার বৈধ পথে উপার্জিত অর্থের বিপরীতে সরকারনির্ধারিত ট্যাক্স প্রদান না করেন, তাহলে তা কালোটাকায় পরিণত হয়ে যায়।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, কালোটাকার সঙ্গে খেলাপি ঋণের কোনো সম্পর্ক আছে কি না? যারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে খেলাপি হচ্ছেন তাদের মধ্যে দুটি শ্রেণি রয়েছে। এদের মধ্যে একশ্রেণির ঋণখেলাপি আছেন, যারা নানা বিরূপ পরিস্থিতির কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন না। আর একটি শ্রেণি আছে যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণের কিস্তি নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করেন না। এরা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি তারাই কিন্তু বেশি পরিমাণে কালোটাকার অধিকারী। তারা ইচ্ছে করে নিজেদের খেলাপি দেখাচ্ছেন। এরা ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে তা অন্য খাতে প্রবাহিত করেন। অথবা বিদেশে পাচার করে দেন। কালোটাকা সৃষ্টির জন্যই এরা ব্যাংক থেকে নানা উপায়ে ঋণ গ্রহণ করেন। ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে যারা খেলাপি হন এবং কালোটাকা সৃষ্টি করেন তারা অত্যন্ত ক্ষমতাবান। রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের কিছু করতে পারে না।
কালোটাকার প্রভাব নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই হবে না। আমাদের টোটাল সিস্টেমটা পর্যালোচনা করতে হবে। কেন কালোটাকা সৃষ্টি হয়, কারা কালোটাকা তৈরি করেন। শেষ পর্যন্ত কালোটাকা কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হয়—এসব বিষয়ে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা যদি লক্ষ করি, তাহলে দেখব, আমাদের দেশের ট্যাক্স নেটওয়ার্ক কত ছোট। অনেকেই নানা কারণে ট্যাক্স প্রদানে আগ্রহী হন না। আবার সবাই যে ট্যাক্স দিতে চান তাও নয়। আমাদের দেশের ট্যাক্স সিস্টেমটাই খুব জটিল। অনেক ট্যাক্স দিতে গিয়ে নানা সমস্যায় পতিত হন। ফলে তারা মনে করেন, ট্যাক্স না দিলে যেহেতু কোনো অসুবিধা হয় না, তাই ট্যাক্স দেওয়ার কোনো দরকার নেই। আসলে এভাবেই কালোটাকা সৃষ্টির রাস্তাগুলোকে প্রসারিত করা হচ্ছে। কালোটাকার মালিকরা ট্যাক্স দিতে আগ্রহী হন না, কারণ আমরা তাদের মনে কোনো ধরনের ভীতি সৃষ্টি করতে পারিনি। বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে কালোটাকার মালিকদের বারবার উত্সাহিত করা হয়েছে। প্রতিবারই কালোটাকা সাদা করার জন্য যে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তা অত্যন্ত উত্সাহব্যাঞ্জক। কারণ ১০ শতাংশ ট্যাক্স প্রদান করলেই কালোটাকা সাদা করা যায়। কিন্তু যারা নিয়মিত ট্যাক্স প্রদান করেন তাদের ট্যাক্সের হার অনেক বেশি। এতে নিয়মিত ট্যাক্স প্রদানকারীরা নিরুত্সাহিত হচ্ছেন। কিন্তু কাজটি উলটো হওয়াই উচিত ছিল। অর্থাৎ যারা নিয়মিত ট্যাক্স প্রদান করেন তারা যাতে উত্সাহিত হন সেই ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা সেটা করতে পারছি না।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার কম কেন? বিনিয়োগ করতে হলে আপনাকে প্রথমেই সঞ্চয় বাড়াতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে, গত তিন বছরে করোনা এবং অন্যান্য কারণে আমাদের জাতীয় সঞ্চয়ের হার কিন্তু ৫ শতাংশ কমে গেছে। বিনিয়োগ বাড়ানোর আগে সর্বস্তরের মানুষকে সঞ্চয়মুখী করে তুলতে হবে। এজন্য সাধারণ মানুষকে সঞ্চয়ের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে হবে। সঞ্চয় বৃদ্ধি পেলে নিশ্চিতভাবেই বিনিয়োগ বাড়বে। আবার এটাও ঠিক যে, সঞ্চয় করলেই বিনিয়োগ বাড়বে, সব সময় তা নাও হতে পারে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বিনিয়োগের কার্যকর পরিবেশ উন্নত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকর্তাদের আচরণ বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে। তারা যাতে কোনো বিনিয়োগকারীকে হয়রানি না করে তা নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগ প্রস্তাব বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধনের পর থেকে বাস্তবায়ন পর্যায় পর্যন্ত অনেকগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অফিসে যেতে হয়। প্রতিটি অফিসে বিনিয়োগকারীদের হয়রানির শিকার হতে হয়। যারা প্রকৃত উদ্যমী ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা তাদের সহায়তা করার জন্য ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। একজন বিনিয়োগকারী সাধারণ কোনো লোক নন। সবাই উদ্যোক্তা হতে পারেন না। উদ্যোক্তা হতে হলে বিশেষ কিছু গুণ থাকতে হয়। কাজেই যাদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মতো গুণাবলি আছে, তাদের সহায়তা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু ব্যাংকগুলো হচ্ছে করপোরেটমুখী। তারা বড় বড় করপোরেট হাউজ ঋণ না নিতে চাইলেও ঋণদান করে। আর যারা নতুন অথচ সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা, তাদের ব্যাংক ঋণ দিতে চায় না। ব্যাংকগুলো ‘তেলা মাথায় তেল’ দিতে খুবই পারদর্শী। অথচ যাদের ঋণের খুবই প্রয়োজন, ব্যাংক তাদের ঋণ দিতে চায় না। আমাদের এসব স্বভাব-চরিত্র পরিবর্তন করতে হবে।
লেখক : মহাপরিচালক, বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেটস
অনুলিখন : এম এ খালেক
