শনিবার, ১৮ মে ২০২৪, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

অদম্য মোবারকের স্বপ্নজয়ের গল্প

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৩, ২২:৩২

প্রায় দেড় যুগ আগে ময়মনসিংহ শহর ছেড়ে ঢাকায় আসেন মোবারক হোসেন। তখন মাত্রই এসএসসি সম্পন্ন করেছেন। বাবা-মা ও ছয় ভাই মিলে মোট ৮ সদস্যের পরিবার, তীব্র আর্থিক টানাপোড়েন। বড়ভাই একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি করে সামান্য বেতন পান, যা দিয়ে কোনোরকম সংসার চলে। ভাইদের মধ্যে তৃতীয় মোবারককেও কাজের আশায় ঢাকামুখী হতে হয়। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ থাকলেও, অর্থকষ্টের কারণে আর তা সম্ভব হয়নি।

এটুকু শুনে গল্পটি আরও আট-দশ জনের মতো ঝড়ে পড়ার গল্প বলে মনে হতে পারে। কিন্তু মোবারকের গল্প তেমন নয়। সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও আত্মশক্তির মাধ্যমে মোবারক তার গল্পটা বদলেছেন। গত মাসে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ৪ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থী  সনদ পেয়েছেন। মোবারকও ছিলেন তাদের মধ্যে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় তাকে এনে দিয়েছে এ সাফল্য।

২০০৬ সালে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ ইউসি হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশের পর মোবারক ঢাকায় এসে চাকরি খুঁজতে শুরু করেন। একটি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিল সংগ্রহের কাজ পান। তবে অল্প টাকা বেতনের সেই চাকরি করে কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। বছর দুয়েক পর এক পর্যায়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে অফিস সহকারী হিসেবে কাজের সুযোগ আসে। এটাই ছিল মোবারকের নিজের গল্প বদলে ফেলার শুরু।

স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের দেখে মোবারক নিজেও পড়াশোনায় ফেরার তাগিদ অনুভব করতেন। পরে ২০১০ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি কলেজের মানবিক বিভাগে ভর্তি হন তিনি। চার বছর পর আবারও শুরু হয় পড়াশোনা। পাশাপাশি চালিয়ে যেতে লাগলেন চাকরি।

উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর মোবারক হোসেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ২০১৮ সালে বিএ সম্পন্ন করেন। এর মাঝে ২০১৭ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। এ সময়টায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়েই স্নাতকোত্তরের ইচ্ছা জাগে। তবে যেহেতু  তিনি বাংলা মাধ্যমে পড়েছেন, তাই ইংরেজিভীতি ছিল; ফলে ইংরেজি কারিকুলামে এমবিএ-তে ভর্তির সাহস পাচ্ছিলেন না। বিএ পাশের পর ব্র্যাকের ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থও হন। পরে ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের শিক্ষক শামীম আহমেদের পরামর্শ ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে শেখা বিষয়গুলো কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় বসেন। সেই চেষ্টা বিফলে যায়নি। শেষপর্যন্ত ৩ দশমিক ১০ সিজিপিএ পেয়ে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এমবিএ সম্পন্ন করেছেন তিনি।

তবে এমবিএ করার যাত্রাটা মোটেও সহজ ছিল না। সেমিস্টার ফি’র বড় অঙ্কের টাকা যোগাতে বেগ পেতে হয়েছে। ব্র্যাকের কর্মী হিসেবে ৫০ শতাংশ ছাড় পেলেও, বাকি টাকা যোগাতে ধারদেনা করতে হয়েছে। স্থাপত্য বিভাগের চেয়ারপারসন প্রফেসর ড. জায়নাব ফারুকী আলীও তাকে সহযোগিতা করেছেন। স্থাপত্য বিভাগের সিনিয়র ডিপার্টমেন্ট কো-অর্ডিনেশন অফিসার সাইদুজ্জামান সিকদারও সবসময় পাশে ছিলেন। অন্য সহকর্মীরাও ছিলেন আন্তরিক।

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় পড়াশোনা করার পর মোবারক হোসেন এখন এ খাতেই কিছু করতে চান। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও যদি তাকে উচ্চতর কোনো পদে চাকরির সুযোগ দেয়, তবে তিনি ব্র্যাকের সঙ্গেই থাকবেন। কারণ, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই তিনি নিজেকে গড়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি ঋণ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

ইত্তেফাক/এসটিএম