তাহারা এত দুঃসাহস কোথা হইতে পায়?

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৩, ০৫:৫৩

দেশে সরকারি প্রকল্প নির্ধারিত সময় শুরু হইয়া যথাসময়ে শেষ হইবার বিশেষ কোনো নজির নাই। প্রায় সকল প্রকল্পের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দফায় দফায় সময় বৃদ্ধি এক অলিখিত নিয়ম হইয়া দাঁড়াইয়াছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন ও সংস্কারমূলক কাজে দীর্ঘসূত্রিতা, অকারণ সময়ক্ষেপণ এবং কাজ না করিয়া অর্থ তুলিয়া লইবার ঘটনা স্বাধীনতার ৫০ বত্সর পরও নিয়মিত ঘটিয়া চলিতেছে। কী ভয়ংকর ব্যাপার! এই সকল দুষ্কর্ম করিতে একটি মহল অত্যন্ত চৌকশ। তাহারা কাজ অসমাপ্ত রাখা, নিম্নমানের কাজ করা, দরপত্রের সঙ্গে সংগতি রাখিয়া দ্রব্য ব্যবহার না করা, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করিয়া হস্তান্তর না করিয়া বিল তুলিয়া লওয়ার ঘটনা নিয়মিতই করিয়া চলিতেছে। অথচ প্রকল্প-সম্পর্কিত গাইডলাইনে প্রকল্পকে সংজ্ঞায়িত করিয়া বলা হইয়াছে, ‘কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রণীত ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ কর্মপন্থাসমূহকে প্রকল্প বলা হয়। প্রকল্প এক বা একাধিক উদ্দেশ্যকে সামনে রাখিয়া নির্দিষ্ট সময় শুরু করিয়া নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করিতে হয়।’

আমরা প্রায়শই দেখিতে পাই, একটি নিবন্ধিত লাইসেন্সধারী ঠিকাদার বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো কাজ গ্রহণ করিয়া দেখা যায় অন্য কোনো ব্যক্তি সেই কাজ করিয়াছেন, অথবা কাজ অর্ধসমাপ্ত রাখিয়া নয়ছয় করিয়া অর্থ তুলিয়া লইয়াছেন। অথচ ঠিকাদারের সেই লাইসেন্স কালো তালিকাভুক্ত করা হয় না! কেন হয় না? কোনো সন্দেহ নাই, যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করিলে এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে এই বিশৃঙ্খল অবস্থা থাকিতে পারিত না। যেই প্রতিষ্ঠানগুলির অর্ধেক বা তাহারও কম কাজ করিয়া অর্থ তুলিয়া লওয়া হইতেছে, যাহারা কাজ লইয়া দরপত্র অনুসরণ করিতেছে না এবং যেই সকল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এহেন কুকর্মের সঙ্গে জড়াইয়া পড়িতেছেন—তাহাদের বিরুদ্ধে কেন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না? অনেকেই বলেন, সরকার যেই কাজ দেয়, সেই কাজের টাকা কাজ না করিয়া ভাগ করিয়া লইতে এই কুচক্রী মহল চরম ঔদ্ধত্যের পরিচয় দেয়। এই কুচক্রীরা অনেকেই সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের কর্মী নহেন। তবে তাহাদের মাথার উপর সরকারি দলের কোনো না কোনো প্রভাবশালীর মদদ বা কালো ছায়া রহিয়াছে। এই জন্য তাহারা এতটাই প্রভাবশালী যে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পর্যন্ত অসহায় থাকে। এমনিতেই সরকারের উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়িতই হয় খুব বেশি হইলে এক-তৃতীয়াংশ। সময়ের কাজ সময়মতো শেষ না করিলে কাজের বাজেটও বৃদ্ধি পাইতেছে। যাহারা ইতিপূর্বে এই ধরনের ক্ষতি করিয়াছে, তাহার পর যাহারা নূতন কাজ পাইতেছে, তাহারাও একই অনিয়ম করিতেছে। এই যে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়, যাহা প্রকৃতপক্ষে জনগণেরই অর্থ—এই অর্থ অপচয় বা আত্মসাৎ করিবার অধিকার কি তাহাদের রহিয়াছে? ইহা তো তাহাদের বাপের অর্থ নহে।

দেশ স্বাধীন হইয়াছে ৫২ বত্সর হইতে চলিল, আর কত? এই যে অপচয় ইহা যদি ৫০ শতাংশও কমাইয়া আনা যাইত, তাহা হইলে সংকট অনেকাংশেই সামাল দেওয়া যাইত। সুতরাং এখন তাহাদের বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া আর কী উপায় রহিয়াছে? শরীরের যেই অংশে ক্যানসার হইয়া যায়, সেই অংশ সমূলে ফেলিয়া দিতে হয়। নচেৎ সেই ক্যানসার পুরা শরীরটাকেই গিলিয়া ফেলিতে উদ্যত হয়। তাহারা এখন সমাজের ক্যানসার হইয়া গিয়াছে। অবস্থা এতটাই অসহনীয় যে, কোনো সুস্থ স্বাভাবিক সমাজ এইভাবে চলিতে পারে না। নিশ্চয়ই চিরকাল এই অসহনীয় অবস্থা চলিবেও না। এক শত বত্সর পর হইলেও এই দেশে সামাজিক বিপ্লব আসিবেই। ইহা ব্যতীত এই অসহনীয় অবস্থার উত্তরণ সম্ভব নহে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন