আসন্ন ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ নানা বাণিজ্যিক এলাকায় নকল ঘি ও সেমাই তৈরির কারখানাগুলো আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে এসব কারখানা থেকে নকল পণ্য চট্টগ্রামসহ দেশের নানা স্থানে সরবরাহ করা শুরু হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বলেন, বিএসটিআইসহ দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমূহের অপ্রতুল নজরদারির মুখে এসব ভেজাল খাদ্যদ্রব্য তৈরির কারখানাগুলো ঈদের আগে বিপুল অঙ্কের টাকা জনগণের কাছ থেকে ভেজাল পণ্য গছিয়ে লুটে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঈদ এলেই ভেজাল তেল ঘি সেমাইয়ের কারখানাগুলো বিশেষ ব্যবস্থাধীনে অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঈদ চলে গেলে ভেজাল পণ্য উৎপাদন যে বন্ধ হয়ে যায়, তা কিন্তু নয়। সারা বছরই চট্টগ্রামসহ দেশের নানা স্থানে বাণিজ্যিক এলাকায় নানা সাইনবোর্ডের আড়ালে ভেজাল ঘি, সেমাই, গুঁড়া মসলা ছাড়াও গায়ে মাখার নানা নকল কসমেটিকস বা প্রসাধনী তৈরি হয় এবং নামীদামী ব্র্যান্ডের নকল মোড়কে সেগুলো বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলে ভেজাল খাদ্য গ্রহণে শরীরের অভ্যন্তরে যেমনি ক্ষতি সাধন হচ্ছে, তেমনি নকল প্রসাধন ব্যবহার করার কারণে জনসাধারণ নানা ধরনের চর্মরোগ এমনকি ত্বকের ক্যানসারে পর্যন্ত আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। সামগ্রিকভাবে নকল যে কোনো পণ্য প্রস্তুতের ক্ষেত্রে ভেজাল পণ্য নির্মাণকারীরা যতটা সংঘবদ্ধ ও কৌশলী, দেশের বিএসটিআইসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ততটা শক্তিশালী ও কৌশলী নয় বলেও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেন।
এদিকে পবিত্র মাহে রমজান ও আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে প্রায় প্রায় ১৫ দিন ধরেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো ভেজাল পণ্য ও প্রসাধনী প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে নানান স্থানে অভিযান শুরু করে। ইতিমধ্যে ভেজাল গুঁড়া মসলা, ভেজাল ঘি, ভেজাল সেমাইসহ নানা ধরনের ভেজাল পণ্য আটক করে জরিমানা করা হয়েছে।
চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে গত ৫ এপ্রিল অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই তৈরি করায় ডায়মন্ড সেমাই ফ্যাক্টরি নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এছাড়া এসব সেমাই তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে অননুমোদিত কেমিক্যাল। আবার প্যাকেটের গায়েও ছিল না মূল্য। গত ২ এপ্রিল ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর নগরীর ২ নম্বর গেটে বিষাক্ত রাসায়নিক হাইড্রোজ দিয়ে জিলাপি তৈরি করার দায়ে রাজবাড়ী রেঁস্তোরাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করে। ৩ এপ্রিল নামীদামী ব্র্যান্ডের মোড়কে নগরীতে নিম্নমানের গুঁড়ো দুধ, গুঁড়ো সাবান, সয়াবিন তেল, জুস পাউডার ইত্যাদি সয়লাব হয়ে গেছে বলে স্থানীয় একটি গণমাধ্যম সূত্র থেকে অভিযোগ করা হয়। ৩ এপ্রিল ফিনলে স্কয়ারে আমদানিকারকের সিল ও স্টিকার ছাড়া বিদেশি প্রসাধনী বিক্রি এবং দেশে তৈরি বোরকাকে মেইড ইন দুবাই বলে বিক্রি করার অপরাধে দুটি প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর। ৩ এপ্রিল চরপাথরঘাটায় ফ্রেসওয়ে ফুড অ্যান্ড বেভারেজি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে স্থানীয় প্রশাসন নামীদামী ব্র্যান্ডের মোড়কে নকল পণ্য বিক্রির ঘটনা উদঘাটন করে ২ লাখ টাকা জরিমানা করে। ৪ এপ্রিল ভোক্তা অধিকার নগরীর ৩টি সেমাই তৈরি প্রতিষ্ঠানকে দূষিত পরিবেশে সেমাই তৈরির জন্য ১ লাখ টাকা জরিমানা করে। অন্যদিকে নগরীর কর্ণফুলী সিডিএ মার্কেটের পাঁচটি দোকানে অননুমোদিতভাবে কসমেটিকস বিক্রির দায়ে ৩৭ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
চট্টগ্রামের পরিবেশবাদী সংগঠন পিপলস ভয়েস-এর সভাপতি শরীফ চৌহান এ ব্যাপারে ইত্তেফাককে বলেন, প্রতি বছর ভেজাল পণ্য ও প্রসাধন কারখানায় অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করা হলেও আইনের ফাঁক গলে ভেজালকারীরা বেরিয়ে এসে তারা এসব অপকর্মে আবারও লিপ্ত হচ্ছে। নানা ধরনের ক্ষতিকর উপাদান দিয়ে ভেজাল ঘি ও সেমাই তৈরি করার কারণে চট্টগ্রামের লাখ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ নগরীতে যে সমস্ত কারখানায় ভেজাল পণ্য তৈরি করা হয় এগুলো বিভিন্ন অভিযানের পর ঘনঘন স্থান পরিবর্তন করে। এমনকি এসব কারখানায় উৎপন্ন ভেজাল পণ্য চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলাসহ দেশের নানান স্থানে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। সহজ-সরল মানুষেরা এসব পণ্য কিনে খাদ্যের সঙ্গে গ্রহণ করে নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, শুধু ভেজাল খাদ্য পণ্যই নয়, সব ধরনের মানুষের ব্যবহার্য প্রসাধনীও নকল কারখানায় প্রস্তুত করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে বলে জানা যায়। মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে এগুলো প্রতিরোধে প্রশাসনকে আরও ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে কঠোর অবস্থানে আসতে হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
