অসুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়িতেছে

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৩, ০৩:২৯

প্রতিযোগিতাকে আমরা ইতিবাচকভাবেই দেখিয়া থাকি। খেলার মাঠ হইতে শুরু করিয়া শিক্ষা, চাকুরি, বাণিজ্য—সর্বত্রই প্রতিযোগিতা রহিয়াছে। প্রতিযোগিতা না থাকিলে পৃথিবী স্থির হইয়া থাকিত, সামনে আগাইবার কোনো তাগিদ থাকিত না। প্রতিযোগিতা সহজাত। জগত সৃষ্টির পর হইতেই মানবজাতি শুধু নহে, পশুসমাজেও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান রহিয়াছে। বলা যায়, প্রতিযোগিতা লইয়াই আমরা জন্মগ্রহণ করি। এমনকি মাতৃগর্ভে স্থান করিয়া লইতে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইতে হয়। আমরা যখন স্কুলজীবনে প্রবেশ করি, সেইখানেই প্রতিযোগিতাটি প্রথম প্রত্যক্ষ করিতে পারি; কিন্তু এই প্রতিযোগিতা স্কুলেই শুরু হয় না। তাহার পর সমগ্র জীবনই প্রতিযোগিতার মধ্যে অতিবাহিত করিতে হয়।

কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা লক্ষ করিতেছি, প্রতিযোগিতা তাহার সুস্থ ধারা ছাড়িয়া অসুস্থ রূপ লাভ করিতেছে। বিশ্বের বড় দেশসমূহের মধ্যে বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করিতেছে শক্তিমত্তা। অর্থাৎ বাণিজ্য প্রতিযোগিতার সংজ্ঞা এখন এইরকম যে—যাহার শক্তি আছে, যাহার হাতে আধুনিক মারণাস্ত্র আছে সে-ই ব্যবসায় সফল হইবে। কলকারখানার ক্ষেত্রে উৎপাদিত মানের দিকে নজর না রাখিয়া সুবিধাদি আদায়ের প্রতিযোগিতা চলিতেছে। যদি একজন সবজি বা ফল বিক্রেতার কথাও বলা হয়, তাহা হইলেও দেখা যাইবে ফরমালিন-কারবাইড মিশাইয়া কে কত লাভবান হইবে—সেই প্রতিযোগিতা। বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমেও আছে প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতাতেও এমনকি আন্তর্জাতিক বড় বড় গণমাধ্যমের মধ্যেও পক্ষাবলম্বনের প্রবণতা তৈরি হইয়াছে, যাহা বিশ্বব্যাপী মানুষের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত।

ইহা সকলের মনে রাখা দরকার যে, সুস্থ প্রতিযোগিতার জন্য নিষ্ঠা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। পরিশ্রমী প্রতিযোগী সর্বদা চূড়ান্ত শিরোপা হাতে না পাইলেও তাহার প্রতিযোগিতা বৃথা যায় না। পৃথিবীতে এখন অধিক বৈচিত্র্যময় পেশা রহিয়াছে। যিনি যেই পেশাতেই থাকুন, নিজের পেশায় নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও মনোযোগ থাকিলে অবশ্যই তিনি সফলকাম হইবেন। এই প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ না হইয়া ভাগ্যান্বেষণের কোনো সুযোগ নাই। এই সম্পর্কে ইসলামের পবিত্র গ্রন্থেও রহিয়াছে সুস্পষ্ট উচ্চারণ। সুরা রা’দ-এ বলা হইয়াছে, ‘তাহার (মানুষের) জন্য তাহার সম্মুখভাগে এবং পশ্চাদ্ভাগে সার্বক্ষণিক প্রহরী নিযুক্ত রহিয়াছে, যে আল্লাহর নির্দেশে তাহাকে রক্ষা করে; এবং আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তাহারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন না ঘটায়।’ ইংরেজিতে একটি কথা রহিয়াছে, ‘তুমি সকল সময় প্রতিযোগিতায় প্রথম হইবে তাহা নহে; কিন্তু তোমাকে সত্যিকার প্রতিযোগী হইতে হইবে।’ ইহা যেন সকল ক্ষেত্রের প্রতিযোগীরা ভুলিতে বসিয়াছে।

আধুনিক যুগে, বিশেষ করিয়া শিল্পবিপ্লবের পর মনুষ্যসমাজে যতই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসারিত হইয়াছে, ততই প্রতিযোগিতা তীব্র হইয়াছে; কিন্তু বর্তমান সময়ের মতো এতটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা বিগত দিনে দেখা যায় নাই। মানুষ ভুলিতে বসিয়াছে, যাহারা সত্যিকার প্রতিযোগিতায় নামিতে নারাজ তাহারা দীর্ঘ মেয়াদে টিকিতে পারিবে না। বহু দেশে শুধু জীবন নহে, অর্থনৈতিক মন্দা তীব্র আকার ধারণ করিয়াছে। সরকারগুলির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ব্যাবসায়িক সম্প্রদায় তাহাদের উৎপাদন ও সরবরাহ লইয়া বিপাকে রহিয়াছে; কিন্তু তাহার পরও যদি নিষ্ঠার সহিত, সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়া কেহ আগাইয়া যায়, নিজের প্রতি আস্থা রাখিতে পারে, তাহা হইলে বিফল হইবার আশঙ্কা থাকে না। উল্লেখ্য, পেশাগত জীবনের সকল ক্ষেত্রেই রহিয়াছে প্রতিযোগিতা, তাহা হউক কেরানির চাকুরি, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, উত্পাদনমুখী ব্যবসা অথবা কোনো এনজিওর চাকুরি; কিন্তু এই প্রতিযোগিতাকে অসুস্থ করিয়া ফেলিলে তাহা কাহারো জন্য শুভ ফল বহিয়া আনিবে না। অসুস্থ প্রতিযোগিতা হইতে আমাদের মুক্ত হইতে হইবে—তাহা রাজনৈতিক অঙ্গনেই হউক অথবা ব্যাবসায়িক অঙ্গনে।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন