শুকরিয়া আদায় করি, শুরুটা আমাদের দিয়ে হয়েছে: আকরাম খান

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৩, ১০:০১

১৩ এপ্রিল তারিখটি বাংলা নতুন বছরের আগের দিন হলেও ক্রীড়াঙ্গনে নতুন সূর্য উদয়ের একটি ঐতিহাসিক দিন। ২৬ বছর আগে ১৯৯৭ সালে এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক ঝড় তুলেছিল ক্রিকেটাররা। সেসময় বাংলাদেশে জনপ্রিয় খেলা হিসেবে ছিলো ফুটবল। খুব কম সংখ্যাক মানুষই ক্রিকেট দেখতেন বা এ খেলার খবর রাখতেন। তবে ১৯৯৭ সালের ১৩ এপ্রিল কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠে কেনিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফি জিতেছিল। আর সেই এক জয় পুরো দেশের মানুষের মনে বিশাল একটি জায়গা দখল করে নেয় ক্রিকেট।

তবে সেই দিন যদি ঐ আইসিসি ট্রফিটা বাংলাদেশ না জিততো তাহলে বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রিকেট যে অবস্থানে তা কখনই সম্ভব হতো না। এমনটি মনে করেন ইতিহাস গড়া বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক আকরাম খান। গতকাল সেই আইসিসি ট্রফি জেতার ২৬ বছর পূর্তির দিনে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আজকে তো প্রায় ২৬ বছর হয়ে গেল এত বড় বড় অর্জন, এত বড় বড় খেলোয়াড় খেলছে সাকিব, তামিম, মুশফিক তারপর মাশরাফি যখন খেলত, আশরাফুল ছিল, তাসকিন, মোস্তাফিজদের দেখে খুবই ভালো লাগে। আমরা যদি আইসিসি কোয়ালিফাই না করতাম তাহলে হয়তো এরা খেলত, এই পর্যায়ে এরা পারফর্ম করতে পারত না। এইদিক থেকে আমাদের খুবই ভালো লাগে। শুকরিয়া আদায় করি, শুরুটা আমাদের দিয়ে হয়েছে।’

আইসিসি ট্রফি জয়ের আগে ক্রিকেটে কোনো সুযোগ সুবিধাই ছিলো না এ দেশে। ছিল না অনুশীলন করার জন্য নিজেদের কোনো মাঠও। গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ছয় মাসের জন্য খেলতে দেওয়া হতো তাদের। তবে সেসব প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে তারা বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে নতুন এক সূচনা। 

সেই দিনগুলোর ক্রিকেটের কথা বলতে গিয়ে সাবেক এ অধিনায়ক বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে ক্রিকেট তখন এই পর্যায়ে ছিল, এখন হকি, ব্যাডমিন্টন যে পর্যায়ে আছে, টেনিস আছে। তখন আমাদের কোনো কাঠামোই ছিল না। আমাদের না কোনো মাঠ ছিল, না কোনো অনুশীলনের জায়গা। ছয় মাসের জন্য বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম পেতাম খেলার জন্য। সেখান থেকে আজকে কিন্তু যে জায়গায় চলে এসেছে। সবকিছু চিন্তা করলে খুবই ভালো লাগে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঐটা আমাদের জন্য ঐতিহাসিক ম্যাচ ছিল। কেননা ১৯৯৪-এ বলা হয়েছিল, টপ তিনটা দল কোয়ালিফাই করবে। আমরা কিন্তু অনেক ফেবারিট ছিলাম ৯৪-এ। কিন্তু আমরা কোয়ালিফাই করতে পারিনি। আমাদের টিমটাও কিন্তু অনেক ভালো ছিল। কিন্তু আমরা কোয়ালিফাই করতে পারিনি। আমাদের ক্রিকেটটা কিন্তু তখন সবার কাছে নেগেটিভ সাইডে চলে গেছিল। বাংলাদেশে তখন কিন্তু ফুটবল অনেক জনপ্রিয় ছিল। নাম্বার ওয়ান স্পোর্টস। তারপরে ১৯৯৭ সালে গেলাম, তখন আমাদের লক্ষ্য ছিল কোয়ালিফাই করতে হবে। আজ ক্রিকেটে যে অবস্থায় আছে, সেখানে আসবে ধারণা ছিল। ওয়ানডে স্ট্যাটাস পেলাম, টেস্ট স্ট্যাটাস পেলাম। সেসময় আমরা প্রত্যেকটা ম্যাচই জিতেছিলাম তবে ওই ম্যাচটা যদি আমরা হেরে যাই বা খেলা না হয়, তাহলে কিন্তু আমরা কোয়ালিফাই করি না, আমাদের আর কোনো খেলার উপায়ই নেই।’

আইসিসি ট্রফি জয়ের ঐ ফাইনাল খেলার স্মৃতিচারণ করে আকরাম খান বলেন, ‘ম্যাচে কঠিন টার্গেট ছিল। ১৭ রানে ৫ উইকেট পড়ে যায়। তার চেয়ে বড় কঠিন ছিল, মাঠে যে পানিগুলো ছিল সেগুলো পরিষ্কার করাটাও কঠিন ছিল। তখন হতো কী আমাদের খেলার জন্য অনেক ট্রাফিক থাকত। সকাল ৬ টা কিংবা সাড়ে ৫ টার দিকে আমাদের চলে যেতে হত। দূরত্ব ১ কিলোমিটার হোক বা ৩০ কিলোমিটার হোক, সবাই আগে চলে যেত। আমাদের রিপোর্টিং ছিল সাড়ে ছয়টা-সাতটার মধ্যে। তখন কিন্তু আমাদের সঙ্গে সাংবাদিকরাও যেতেন। মানে অনেক সাংবাদিক যারা ঢাকা থেকে গিয়েছিলেন। ওইখানে গিয়ে যখন বৃষ্টি হলো, একটা সময় দিয়েছিল। ঐ সময়ের মধ্যে যদি মাঠ উপযুক্ত হয়, তাহলে খেলা হবে না হলে হবে না। না হলে তো আমরা কোয়ালিফাই করছি না। তখন আমি দেখেছি, আমাদের সাংবাদিক ভাইয়েরা ছিলেন। আমরা বাসে যাওয়ার সময় অনেক ঠান্ডা লাগতো তাই সবাই একটা এক্সট্রা টাওয়েল নিয়ে যেতাম, ২০-২৫ টা টাওয়েল নিয়ে সাংবাদিক ভাইয়ের সঙ্গে প্রচুর বাংলাদেশি ছিল। ওরা সবাই মিলে মাঠ থেকে টাওয়েল দিয়ে মাঠ শুকিয়েছিল। তারপরে ম্যাচটা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে ম্যাচটা আমাদের জন্য জরুরি ছিল। ম্যাচটা জিতে আমরা কোয়ালিফাই করেছি।’

সেই ঐতিহাসিক জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী ফোন করেন খেলোয়াড়দের পাঠিয়েছিলেন প্রাইভেট বিমানও। এ বিষয়ে আকরাম খান বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা ছিল ফাইনাল জিতে শপিংয়ে যাবো। তবে শপিংয়ে আর যাওয়া হয়নি। ম্যাচ জেতার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে ফোন পাই। তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। তিনি আমাদের বললেন, ‘তোমারা আজই (১৩ এপ্রিল ১৯৯৭) চলে এসো।’ এ কথা শুনে আমরা তো অবাক তখনও বুঝতে পারিনি, আমাদের জন্য কী আয়োজন হচ্ছে। যেহেতু তখন বিদেশ যাওয়াটা আমাদের জন্য সহজ ছিল না। ফলে শপিং করতে না পেরে কিছুটা মন খারাপ হয়েছিল! প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য প্রাইভেট প্লেন পাঠিয়ে দিলেন। আমরা চলে আসছি, কিন্তু জানতাম না এত কিছুর আয়োজন হচ্ছে। এয়ারপোর্ট থেকে তার বাসায় গেলাম। খাওয়া দাওয়ার পর তিনি বললেন, ‘চলো আমাদের এক জায়গায় যেতে হবে। তখনও কিছু বুঝিনি। যখন বাস থেকে নেমে স্টেজে গেলাম, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। না হলেও সেখানে এক লাখের বেশি লোক হবে। এই সংবর্ধনাই আজ বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এতটা জনপ্রিয় করেছে। আমারা টুর্নামেন্ট একটা জিতেছি সেটা ঠিক আছে তবে ঐ সংবর্ধনায় ঘরে ঘরে বার্তাটি চলে গিয়েছিল যে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আর তারপর থেকে ক্রীড়াঙ্গনে এক নম্বরে চলে আসে ক্রিকেট।’

এসময় ঐতিহাসিক দিনে নিজের একটি আফসোসের কথা জানান টাইগাদের ক্রিকেটে ইতিহাস গড়া এ ক্রিকেটার। তার আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাস। কারণ শুরু কিন্তু এখান থেকেই হয়েছে। শুধু এইটা না স্বাধীনতার পর থেকে যারা ক্রিকেটের সঙ্গে ছিলেন, আছেন। এই জিনিসটা কিন্তু ধরে রাখা বোর্ডের দায়িত্ব। আজকে ২৬ বছর হয়ে গেল আইসিসি ট্রফি জয়ের। একটা গেট টুগেদার করা উচিত ছিল। ক্রিকেট বোর্ড বলেন, কোয়াব বলেন, করা উচিত ছিল। এখানে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে যদি এসব তুলে না ধরেন, তাহলে জিনিসটা মানুষের মনে থাকবে না। এটাতে আমাদের একটু মনোযোগী হওয়া উচিত। এগুলো ধরে রাখা উচিত এবং মানুষকে জানানো উচিত যে আজকে ক্রিকেটে এই পর্যায়ে আছে আগে কেমন ছিলো..... আজকে আমাদের ৮টা মাঠ আছে, ২৫ বছর আগে একটা মাঠও ছিল না। আজকে আমাদের এত ইনডোর আছে, একাডেমি আছে। ক্যাম্প করছি এগুলো মানুষকে জানানো উচিত।’

ইত্তেফাক/এসএস